একটি সিদ্ধান্তের দাম
পর্ব–৫ : যে সিদ্ধান্ত জীবন বদলে দিল (সমাপ্তি)
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ধারাবাহিক গল্প
আদালতের নোটিশটা টেবিলের ওপরই পড়ে রইল।
সারারাত কেউ ওটা ধরেনি।
ভোরে নিশি উঠে দেখল, অভিক বারান্দায়। হাতে চায়ের কাপ। ঠান্ডা হয়ে গেছে, এক চুমুকও দেয়নি।
নিশি পাশে দাঁড়াল। “কী ভাবছ?”
অভিক অনেকক্ষণ পর বলল, “একটা ভুল করতে আমার পাঁচ মিনিট লেগেছিল। এখন মনে হচ্ছে, সেই পাঁচ মিনিটের হিসাব দিতে হয়তো পাঁচ বছর লাগবে। লাগতেও পারে।”
নিশি উত্তর দিল না।
কিছু কথার জবাব নীরবতাই। সেটা সে শিখে গেছে।
সেদিনই তারা গেল একজন উকিলের কাছে। পুরানা পল্টনের তিনতলায় ছোট চেম্বার। ফ্যান ঘুরছে, কাগজ উড়ছে।
সব কাগজ খুলে দেখানোর পর তিনি চশমা নামিয়ে বললেন, “পালালে বিপদ বাড়বে। যাদের কাছে টাকা বাকি, তাদের সঙ্গে বসেন। লিখিত সময় নেন। যতটুকু পারেন, নিয়ম মেনে কিস্তি দেন। কোর্টে হাজিরা মিস কইরেন না।”
ফেরার পথে রিকশায় অভিক বলল, “জানো, এত দিন শুধু ভাবছিলাম কীভাবে টাকা ফেরত দেব। আজ বুঝলাম, তার আগে নিজের মুখটা ফেরত আনা দরকার।”
নিশি তাকিয়ে রইল।
অনেক দিন পর অভিকের গলায় অনুতাপ শুনল। সাজানো না, আসল।
পরের কয়েক মাস কঠিন গেল। খুব।
অভিক অফিসে ফিরল। পনেরো দিনের ছুটি শেষে জয়েন করেই ওভারটাইম শুরু করল। শুক্রবারেও মগবাজারের একটা দোকানের হিসাব মেলাত ৮০০ টাকায়।
নিশিও বসে থাকেনি। ঘরে বসে অনলাইনে নকশিকাঁথা আর হাতে-আঁকা কুর্তির অর্ডার নিল। প্রথম মাসে এলো ৩,২০০ টাকা।
টাকা বেশি না।
কিন্তু মাস শেষে একটা করে কিস্তি জমা পড়ত। রাশেদ সাহেবের খাতায় একটা দাগ পড়ত। এনজিওর রিসিপ্টে একটা সিল।
যেদিন প্রথম একজন পাওনাদার টাকা নিয়ে বললেন, “ঠিক আছে, বাকিটাও এভাবেই দিয়েন,” সেদিন বাড়ি ফিরে অভিক অনেক দিন পর লম্বা নিঃশ্বাস ফেলল। বুকের ওপর থেকে পাথর নামল কি না কে জানে।
এক সন্ধ্যায় আলমারি গোছাতে গিয়ে নিশি খালি গয়নার বাক্সটা বের করল। লাল ভেলভেটের ভেতরটা ফাঁকা। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার রেখে দিল।
অভিক দেখে ফেলেছিল।
ধীরে এসে বলল, “আমি কথা দিচ্ছি, একদিন সব ফিরিয়ে দেব।”
নিশি মাথা নাড়ল। “গয়না ফেরানো যায়।”
অভিক চুপ।
“কিন্তু একটা কথা মনে রেখো, আমি গয়না হারিয়ে যতটা কষ্ট পাইনি, তার চেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছিলাম যেদিন তুমি আমাকে সত্যিটা বলোনি।”
অভিকের চোখ ভিজে উঠল। “আর কখনও তোমার কাছ থেকে কিছু লুকাব না।”
নিশি প্রথমবার হালকা করে হাসল। “এই কথাটাই আমার সবচেয়ে দামি গয়না।”
এক বছর পর।
ঋণের বড় অংশ শোধ হয়েছে। ১ লাখ ২০ হাজারের মধ্যে ৯০ হাজার গেছে। এখনও বাকি।
তাদের জীবন বিলাসী নয়। এখনও মাসের শেষে হিসাব মেলাতে হয়। তবু রাতের ঘুমটা শান্ত। ফোন সাইলেন্ট করে রাখতে হয় না আর।
একদিন ছাদে দাঁড়িয়ে সূর্য ডুবতে দেখছিল দুজন। আকাশটা লালচে। নিচে গাড়ির হর্ন, কিন্তু অসহ্য লাগছে না।
অভিক বলল, “যদি সময়টা আবার ফিরে পেতাম...”
নিশি কথা শেষ করতে দিল না। “মানুষ সময় ফেরত পায় না।”
“তাহলে?”
“মানুষ শিক্ষা পায়। সেটাই থাকে।”
অভিক মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
হয়তো এটাই সত্যি।
আজও অভিক যখন কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেয়, একা নেয় না।
আগে নিশির সঙ্গে বসে। চা নিয়ে। কথা বলে। মাঝে মাঝে দ্বিমত হয়, তবু বলে।
কারণ সে শিখেছে, সংসারে সবচেয়ে ভয়ের ভুলটা শুধু ভুল সিদ্ধান্ত নয়। যে সিদ্ধান্তে নিজের মানুষটাকে অন্ধকারে রাখা হয়, সেটা সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে।
একটা পরিবার একদিনে ভাঙে না।
ভাঙন শুরু হয় সেই দিন, যেদিন বিশ্বাসের জায়গাটায় গোপনীয়তা এসে বসে। আর সংসার টিকে থাকে তখনই, যখন দুজন মানুষ একে অপরের বিরুদ্ধে না, সমস্যার বিরুদ্ধে একসঙ্গে দাঁড়ায়।
------------------------সমাপ্ত।-------------------------------
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।