যে স্বপ্নের দাম বেশি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ১৭ আগষ্ট, ২০২৬
মেঘলা একদিন হঠাৎ বলল, “বাবা, আমি কিন্তু একদিন নিজের একটা গাড়ি কিনব।”
অভিক তখন বারান্দার গ্রিল মুছছিল। কাঁধে পুরোনো গামছা। মেয়ের কথা শুনে হাত থামিয়ে তাকাল। “গাড়ি?”
“হ্যাঁ। নিজের টাকায়। তোমার মতো কিস্তি, ধার—এসব ছাড়া।”
পাশের ঘর থেকে মিশি ফোড়ন কাটল, “আগে চাকরিটা পাস কর, তারপর গাড়ি।”
“তুই চুপ করবি?”
“ভুল কী বললাম?”
অভিক হেসে ফেলল। “কিনবি। কেন কিনবি না? স্বপ্ন দেখতে কি টাকা লাগে?”
রান্নাঘর থেকে নিশি বলল, “স্বপ্ন দেখতে লাগে না। পূরণ করতে লাগে।”
অভিক আর কথা বাড়াল না। গামছাটা দিয়ে আবার গ্রিল ঘষতে লাগল।
মাসের শেষদিকে সংসারটা এমনিতেই টানাটানিতে চলে। ফ্রিজের মাথায় রাখা ছোট খাতাটা খুলে আগের রাতে অভিক হিসাব করেছিল—বাড়িভাড়া, বাজার, বিদ্যুৎ, মেঘলার বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি, মিশির সেমিস্টার ফি। সব যোগ করার পর পাতার নিচে নিজের জন্য আর কিছুই থাকল না। খাতাটা বন্ধ করে সে উঠে গিয়েছিল।
মেঘলা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষে। কয়েক মাস ধরে বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য একটা স্কলারশিপের চেষ্টা করছিল। এক সন্ধ্যায় দরজা খুলেই চিৎকার করে উঠল, “বাবা!”
অভিক টেবিলে বসে পেঁয়াজ কাটছিল। “কী হলো?”
“আমার নাম এসেছে!”
“কোথায়?”
মেঘলা মোবাইলটা তার সামনে ধরল। “শর্টলিস্টে।”
অভিক চশমা চোখে দিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। “ভালো করেছিস।”
“শুধু ভালো?”
“খুব ভালো করেছিস।”
মেঘলা বাবাকে জড়িয়ে ধরল। একটু পর আস্তে করে বলল, “একটা সমস্যা আছে।”
“কী?”
“কিছু টাকা লাগবে।”
অভিকের হাতে থাকা ছুরিটা থেমে গেল। “কত?”
মেঘলা অঙ্কটা বলল। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে অভিক বলল, “হবে।”
“সত্যি?”
“হবে বলছি তো।”
মেঘলা চলে যেতেই নিশি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল। “কোথা থেকে হবে?”
অভিক আবার পেঁয়াজ কাটতে শুরু করল। “দেখব।”
নিশি তাকিয়ে রইল। “তোমার এই ‘দেখব’ কথাটাই আমার ভয় লাগে।”
“কেন?”
“এরপর তুমি নিজের কিছু একটা বিক্রি করে দাও।”
অভিক একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “সবকিছুতেই আগে থেকে ভয় পাও কেন?”
“কারণ তোমাকে চিনি।”
দুদিন পর আলমারি খুলে অভিক বাবার দেওয়া পুরোনো ঘড়িটা বের করল। কাঁচে সরু একটা আঁচড়। বেল্ট শক্ত হয়ে গেছে। নিশি দরজায় দাঁড়িয়ে বলল, “ওটা নিও না।”
“কেন?”
“তোমার বাবার ঘড়ি।”
“জানি।”
“তাহলে?”
অভিক ঘড়িটা হাতে ঘুরিয়ে বলল, “মেঘলার দরকার।”
“সব প্রশ্নের এক উত্তর দাও কেন?”
অভিক পকেটে ঘড়িটা ঢুকিয়ে বলল, “আছে তো, তোরাই তো আছিস। আর কী লাগে?”
নিশি ধীরে বলল, “তোমার নিজের কিছু লাগে না?”
অভিক উত্তর দিল না।
সেদিন রাতে মেঘলা আবার টাকার কথা তুলল। “বাবা, ওরা সময় দিয়েছে।”
“জানি।”
“আর কতদিন?”
“দুদিন দে।”
“তুমি সবসময় দুদিন বলো।”
অভিক বিরক্ত হয়ে বলল, “তাহলে কী বলব? কালই হবে?”
“আমি সেটা বলিনি। তুমি যদি আগে বলতে টাকার সমস্যা, আমি অন্যভাবে চেষ্টা করতাম।”
“আমি কি বলেছি পারব না?”
“না। কিন্তু তুমি শুধু বলো ব্যবস্থা করছি। কী ব্যবস্থা করছ, সেটা তো বলো না।”
অভিক চেয়ার সরিয়ে উঠে গেল।
রাতে মেঘলার ঘুম এল না। পানি খেতে উঠে দেখল, বারান্দার আলো জ্বলছে। অভিক একা বসে। সামনে হিসাবের খাতা। বাড়িভাড়া, মেঘলার ফি, মিশির ফি, বাজার, বিদ্যুৎ—সব লেখা। তার নিচে ছোট করে লেখা, শার্ট—১২০০। পাশে পেন্সিলের দাগ। কেটে দেওয়া হয়েছে।
মেঘলা আস্তে বলল, “বাবা।”
অভিক খাতা বন্ধ করল। “ঘুমাসনি?”
“না। শার্টটা কেটে দিলে কেন?”
“পরে কিনব।”
“ঘড়িটাও বিক্রি করেছ?”
“হুম।”
“আমার জন্য?”
অভিক একটু থেমে বলল, “তোর ফর্মের জন্য।”
মেঘলা নিচু হয়ে বসে পড়ল। “আমি যদি না যাই?”
“কোথায়?”
“বিদেশে।”
অভিক এবার তাকাল। “কেন?”
“এত টাকা লাগবে...”
“এসব নিয়ে এখন ভাবিস না। তুই পড়াটা ঠিকমতো কর।”
মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “তোমার সামনে কিছু নেই?”
অভিক হেসে ফেলল। “আছে তো। কাল সকালে বাজারে যেতে হবে। সকালে গেলে মাছটা একটু কমে পাওয়া যায়।”
মেঘলাও হেসে ফেলল।
পরদিন সে বিদেশ যাওয়ার স্বপ্নটা বাদ দিল না। শুধু পুরোটা বাবার ঘাড়ে চাপিয়ে রাখল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক স্যারের সঙ্গে কথা বলল, আরেকটা স্কলারশিপে আবেদন করল, পার্টটাইম কাজের খোঁজ শুরু করল। মিশিও তার স্টুডিওর পরিকল্পনা ছোট করল। বন্ধুর সঙ্গে অনলাইনে কাজ শুরু করল।
সংসারের টানাটানি অবশ্য কমল না।
একদিন বাজার থেকে ফিরে নিশি অভিকের শার্টের ছেঁড়া কলারটা দেখে বলল, “এইটা পরে অফিসে যাবে?”
“যাবে।”
“একটা নতুন কিনো।”
“এই মাসে?”
“হ্যাঁ।”
অভিক হেসে বলল, “টাকা দেবে?”
নিশি তার দিকে তাকিয়ে বলল, “দেখব।”
অভিক হেসে ফেলল।
বেতনের দিন অফিস থেকে ফেরার পথে সে একটা দোকানে ঢুকল। অনেকক্ষণ দেখে একটা শার্ট পছন্দ করল। দাম শুনে একটু থামল। তারপর বলল, “এটাই দেন।”
বাড়িতে ঢুকতেই মিশি বলল, “বাবা, নতুন শার্ট?”
“হুম।”
মেঘলা এসে বলল, “ভালো লাগছে।”
অভিক তাকিয়ে হাসল। “সত্যি?”
“হ্যাঁ।”
নিশি রান্নাঘর থেকে বলল, “চা দেব?”
“দাও।”
“আজ এত খুশি কেন?”
অভিক নতুন শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে বলল, “কিছু না। নিজের জন্য কিনলাম তো।”
তারপর বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। মেঘলা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বাবার দিকে তাকিয়ে রইল।
অভিক নিচের রাস্তার দিকে তাকিয়ে শার্টের হাতাটা আরেকটু গুটিয়ে নিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।