সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার
গল্প-৯
বন্ধ দরজা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প
৯, জুলাই, ২০২৬
বাড়ির দোতলার শেষ ঘরটা পাঁচ বছর ধরে বন্ধ।
দরজার গায়ে ধুলো জমেছে। তালায় মরিচা। তবু প্রায় প্রতি রাতেই, ঠিক তিনটার দিকে, একটা শব্দ ভেসে আসে।
ঘষ...
ঘষ...
যেন কেউ কাঠের একটা চেয়ার ধীরে ধীরে টেনে সরাচ্ছে।
প্রথম কয়েক দিন অভিক ভেবেছিল, পুরোনো বাড়ি। কাঠ ফুলে-ফেঁপে এমন শব্দ হতেই পারে।
কিন্তু প্রতিদিন একই সময়ে?
একদিন নাশতার টেবিলে কথাটা তুলতেই ঘরে হঠাৎ নীরবতা নেমে এল।
মা শুধু বললেন,
— ও ঘর নিয়ে আর কথা বলিস না।
বড় চাচা চায়ের কাপ নামিয়ে বললেন,
— পুরোনো বাড়িতে কত রকম শব্দ হয়।
এরপর আর কেউ কিছু বলল না।
বিষয়টা যেন সেখানেই শেষ।
কিন্তু অভিকের মাথা থেকে নামল না।
সেই রাতেই নিশিকে নিয়ে দোতলায় উঠে গেল।
দুজনেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।
ঘড়িতে তিনটা বাজতেই আবার...
ঘষ...
ঘষ...
নিশি এবার অভিকের দিকে তাকাল।
কিছু বলল না।
তারও শোনা হয়েছে।
পরদিন অভিক বাড়ির পুরোনো কেয়ারটেকার করিম চাচার কাছে গেল।
লোকটা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন।
তারপর বললেন,
— ওই ঘরে একসময় তোমার দাদু থাকতেন।
এর বেশি আর একটা কথাও বের করা গেল না।
বাড়িতে ফিরে অভিক বুঝল, সবাই যেন ইচ্ছে করেই বিষয়টা এড়িয়ে যাচ্ছে।
যেন দরজার ওপাশে শুধু একটা ঘর না, অনেক দিনের চেপে রাখা একটা স্মৃতিও আটকে আছে।
নিশি বলল,
— শব্দটার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সবাই এটা নিয়ে কথা বলতে চায় না কেন?
কথাটা মাথায় গেঁথে গেল।
কয়েক দিন পর স্টোররুমে পুরোনো জিনিসপত্র ঘাঁটতে গিয়ে অভিক একটা অ্যালবাম পেল।
একটা ছবিতে দাদু জানালার পাশে বসে বই পড়ছেন।
নিচে কাঠের একটা দোলচেয়ার।
ছবিটা হাতে নিয়েই অভিকের বুকের ভেতর কেমন যেন কেঁপে উঠল।
ঠিক এই রকম শব্দই তো তারা রাতে শুনছে।
সে ছবিটা নিয়ে মায়ের কাছে গেল।
মা অনেকক্ষণ ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর আস্তে বললেন,
— শেষ তিন বছর উনি ওই ঘরেই ছিলেন।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতি হারাতে শুরু করেছিলেন।
রাতে ঘুম ভেঙে যেত।
চেয়ারটা টেনে জানালার কাছে নিয়ে বসে থাকতেন।
— কার জন্য?
মা উত্তর দিলেন না।
শুধু চোখ নামিয়ে রাখলেন।
সেদিন রাতে বড় চাচা নিজেই অভিকের ঘরে এলেন।
হাতে একটা পুরোনো ডায়েরি।
— এবার তোর জানার সময় হয়েছে।
ডায়েরির শেষের পাতাগুলো কাঁপা হাতে লেখা।
"আজও মনে হয়, ও ফিরে আসবে। তাই জানালার পাশে বসে থাকি।"
আরেক পাতায়—
"সেদিন রাগ করে দরজাটা আমিই বন্ধ করেছিলাম। যদি আর একবার খুলে দিতাম..."
অভিক মাথা তুলে তাকাল।
— ও মানে?
বড় চাচা ধীরে বললেন,
— আমার ছোট ভাই।
তোর ছোট কাকা।
বাবার সঙ্গে ঝগড়া করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।
রাগের মাথায় বাবা বলেছিলেন, "এই বাড়ির দরজা আর তোর জন্য খুলবে না।"
তিন দিন পর খবর এল, সড়ক দুর্ঘটনায় ও মারা গেছে।
অনেকক্ষণ কেউ কথা বলল না।
তারপর বড় চাচা বললেন,
— আইন বাবাকে দোষী করেনি। কিন্তু উনি নিজেকে কোনো দিন ক্ষমা করতে পারেননি।
প্রতি রাতে ওই চেয়ার টেনে জানালার পাশে বসতেন।
মনে করতেন, যদি ছেলে ফিরে আসে...
দাদুর মৃত্যুর পর ঘরটা আর খোলা হয়নি।
পরদিন সকালে তালা খোলা হলো।
ঘরে ঢুকতেই পুরোনো কাঠ আর বন্ধ ঘরের গন্ধ।
জানালার পাশে সেই দোলচেয়ার।
নিশি এগিয়ে গিয়ে হাত রাখতেই চেয়ারটা একটু নড়ে উঠল।
ঘষ...
দুজনেই একসঙ্গে তাকাল।
চেয়ারের একটা পা ভেঙে গেছে।
জানালা দিয়ে বাতাস ঢুকলেই কাঠে ঘষা লাগে।
বছরের পর বছর তারা যে শব্দ শুনেছে, সেটার উৎস এটাই।
অভিক চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো, এত দিন শব্দটা শুধু কাঠের ছিল না।
এই বাড়ির প্রত্যেক মানুষ নিজের ভেতরে সেই শব্দ বয়ে বেড়াচ্ছিল।
ঘর থেকে বেরিয়ে আসার আগে বড় চাচা দরজায় হাত রেখে বললেন,
— ভাবতাম, ঘরটা বন্ধ রাখলে হয়তো কষ্টটাও ভেতরে আটকে থাকবে।
ভুল ভেবেছিলাম।
সেদিন রাতেও তিনটা বেজেছিল।
অভিকের ঘুম ভাঙল।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে শুয়ে রইল।
কোনো শব্দ এল না।
নিশি ফিসফিস করে বলল,
— আজ খুব চুপচাপ লাগছে, না?
অভিক জানালার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
— হ্যাঁ।
তারপর খুব আস্তে বলল,
— কিছু দরজা বাইরে থেকে বন্ধ থাকে।
আর কিছু দরজা খুলতে সবচেয়ে বেশি সময় লাগে মানুষের নিজের ভেতরে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।