হিসাবের খাতা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ২৩ জুন,২০২৬
বিয়ের দশ বছর পর সায়মা প্রথমবার রাশেদের ব্যাংকের হিসাব দেখল।
ইচ্ছে করে নয়।
আলমারি গোছাতে গিয়ে পুরোনো একটা ফাইল পড়ে গিয়েছিল মেঝেতে। ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছিল একটা নীল রঙের পাসবই, আর কয়েকটা ভাঁজ করা কাগজ।
সায়মা তুলে রাখতে গিয়েও থেমে গেল।
গত তিন মাস ধরে সংসারে টাকা নিয়ে প্রায় প্রতিদিন কথা কাটাকাটি হচ্ছে। ছোট ছোট জিনিস নিয়ে।
গতকালও হয়েছিল। মেয়ে আরিশার স্কুলের জুতোটা ছিঁড়ে গেছে, সামনের সোলটা হাঁ হয়ে আছে। সায়মা বলেছিল, "এবার একটা ভালো দেখে কিনে দাও।"
রাশেদ বলেছিল, "সামনের মাসে দেখি।"
সায়মা রেগে বলেছিল, "তোমার কাছে আমার কোনো কথারই দাম নেই।"
রাশেদ আর কিছু বলেনি। শুধু চুপ করে বাইরে চলে গিয়েছিল।
সেই চুপ করে থাকাটাই সায়মার সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগত।
পাসবইটা খুলে সায়মা প্রথমে বুঝতে পারছিল না।
প্রতি মাসের পাঁচ তারিখে বেতন ঢোকে, আটত্রিশ হাজার টাকা।
তারপর সাত তারিখের মধ্যে টাকা বেরিয়ে যেতে থাকে।
বাড়িভাড়া বারো হাজার।
একটা নাম লেখা, "মা – ৪,০০০"। প্রতি মাসে।
আরেকটা, "সোহেল মেস – ২,৫০০"। এটা রাশেদের ছোট ভাই, যে ময়মনসিংহে পড়ে।
একটা অটো-ডেবিট, "লোন ইএমআই – ৩,৬৮০"। সায়মা এই লোনের কথা জানত না।
পাশে ছোট করে পেন্সিলে লেখা, "আব্বার চিকিৎসা – ২০২১"।
শেষ পাতায় কয়েকটা ওষুধের নাম লেখা, তারিখ সহ। "প্রেশারের ওষুধ – মা"।
সায়মা পাতা উল্টাতে লাগল।
প্রতি মাসে আরিশার স্কুল বেতন ছয় হাজার টাকা ঠিক সময়ে গেছে। বাজার খরচের জন্য তার হাতে পনেরো হাজার টাকা তুলে দেওয়ার পর রাশেদের নিজের অ্যাকাউন্টে পড়ে থাকত দুই থেকে তিন হাজার টাকা।
সেই টাকা থেকেই যেত মায়ের ওষুধ, ভাইয়ের মেস ভাড়া, আর সেই পুরোনো লোনের কিস্তি।
ফাইলের ভেতরের ভাঁজ করা কাগজগুলো ছিল ওষুধের প্রেসক্রিপশন। তারিখগুলো গত দুই বছরের।
সায়মা অনেকক্ষণ মেঝেতে বসে রইল। পাসবইটা হাতে ধরা।
তার মনে পড়ল, গত ঈদে সে একটা জামদানি শাড়ির কথা বলেছিল। রাশেদ বলেছিল, "এবার থাক।" সায়মা ভেবেছিল, মানুষটা কৃপণ হয়ে যাচ্ছে।
আজ বুঝল, মানুষটা কৃপণ হয়নি। শুধু ভাগটা সবার আগে অন্যদের দিয়ে, নিজের ভাগটা একদম শেষে রেখেছিল। আর সেই শেষের ভাগটা নিয়েও কখনো কিছু বলেনি।
রাতে রাশেদ ফিরল দেরি করে।
টেবিলে ভাত ঢাকা।
সায়মা চুপচাপ খাবার বেড়ে দিল।
রাশেদ খেতে শুরু করল। কিছুক্ষণ পর বলল, "আরিশার জুতোর টাকাটা আমি কাল দিয়ে দেব। একজনের কাছে চেয়েছিলাম।"
সায়মা কিছু বলল না।
খাওয়া শেষ হলে সে চায়ের কাপটা এনে রাশেদের সামনে রাখল। তারপর পাসবইটা টেবিলের ওপর রাখল।
রাশেদ চমকে তাকাল।
"এটা কোথায় পেলে?"
"আলমারি গোছাতে গিয়ে।"
রাশেদ চুপ করে গেল।
"তুমি আমাকে কখনো বলোনি কেন?" সায়মা ধীরে বলল।
রাশেদ চায়ের কাপটা হাতে নিল।
"বললে কী হতো। তুমি তো তোমার খরচ কমিয়ে দিতে। আরিশারটা কমাতে। আমি চাইনি।"
"তাহলে নিজেরটা কমালে কেন?"
রাশেদ হাসার চেষ্টা করল। "আমার তো তেমন কিছু লাগে না।"
সায়মা আর কিছু বলল না।
দশ বছরে এই প্রথম তার মনে হলো, যে মানুষটার সঙ্গে সে প্রতিদিন ঝগড়া করে, সেই মানুষটার একটা পুরো হিসাবের খাতা তার অজানা রয়ে গেছে।
সেদিন রাতে সায়মা হিসাবের খাতাটা খুলল।
নতুন একটা পাতায় লিখল, "আরিশার জুতো"।
তার নিচে লিখল, "মায়ের ওষুধ"।
তারপর কলমটা থামিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইল।
বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল না। ঘরটা চুপচাপ ছিল। শুধু টেবিলের ওপাশে রাশেদের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।