ফুটপাতের শৈশব
পর্ব ১০ — আমরা কেমন বাংলাদেশ রেখে যাচ্ছি।
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী | ১৮ আগস্ট ২০২৬
একটি দেশের ভবিষ্যৎ শুধু তার বড় বড় ভবনে দেখা যায় না। ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা শিশুটির চোখেও দেখা যায়।
শহরে নতুন রাস্তা হচ্ছে, সেতু হচ্ছে, ভবন উঠছে। অর্থনীতি এগোচ্ছে, প্রযুক্তি বদলাচ্ছে। এসব উন্নয়ন অবশ্যই দরকার। কিন্তু উন্নয়নের এই ছবির বাইরে আরেকটি বাংলাদেশও আছে।
সেই বাংলাদেশে কোনো শিশু সকালে স্কুলের পোশাক পরে বের হয় না। তার কাঁধে বইয়ের ব্যাগ নেই। সে হয়তো ট্রাফিক সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকে, ফুল বিক্রি করে, বোতল কুড়িয়ে বেড়ায় কিংবা গাড়ির কাচ মোছে।
রাত হলে হয়তো ফুটপাতের এক কোণে শরীরটা গুটিয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
আমরা তাকে বলি—পথশিশু।
কিন্তু সে শুধু পথশিশু নয়।
সে এই দেশেরই একজন শিশু। এই দেশের ভবিষ্যতেরই একটা অংশ।
তাহলে প্রশ্ন হলো—আমরা কি তাকে সত্যিই সেই ভবিষ্যতের অংশ হিসেবে দেখছি?
উন্নয়নের বাইরে থাকা শিশুরা
একটি দেশের উন্নয়ন মাপতে আমরা অর্থনীতি, আয়, রাস্তাঘাট, সেতু, বিদ্যুৎ কিংবা প্রযুক্তির হিসাব করি। এগুলো গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু আরও কিছু প্রশ্ন আছে।
একটা শিশু রাতে নিরাপদে ঘুমাতে পারে কি না।
ক্ষুধার কারণে তাকে কাজে নামতে হয় কি না।
দরিদ্র পরিবারের সন্তান নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে কি না।
অসুস্থ হলে চিকিৎসা পায় কি না।
পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হলে তার নিরাপদ আশ্রয় আছে কি না।
এসব প্রশ্নের উত্তরও বলে দেয় একটি দেশ কতটা এগিয়েছে।
কারণ একটা নতুন সেতু মানুষের যাতায়াত সহজ করতে পারে। কিন্তু একটা শিশুর নিরাপদ শৈশব একটি দেশকে মানবিক করে।
শুধু সহানুভূতি যথেষ্ট নয়
পথশিশুকে দেখে আমাদের মায়া হয়। আমরা খাবার দিই, জামা দিই, শীতে কম্বল দিই। এসব প্রয়োজনীয়।
কিন্তু খাবার শেষ হওয়ার পর?
ঈদ চলে যাওয়ার পর?
শীত শেষ হওয়ার পর?
শিশুটির জীবন তো থেকেই যায়।
তাই একদিনের সাহায্যের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সমাধানও দরকার।
শিশুর জন্য নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা ও খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। যে শিশু স্কুল থেকে ঝরে পড়েছে, তাকে আবার শিক্ষায় ফেরানোর বাস্তব পথ তৈরি করতে হবে।
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—কেন সে রাস্তায় এসেছে, সেই কারণটাও দেখতে হবে।
পরিবার যদি শিশুর আয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে শুধু শিশুকে কাজ থেকে সরিয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। পরিবারের জন্য কর্মসংস্থান, সামাজিক সহায়তা ও আয় করার সুযোগ তৈরি করতে হবে।
কারণ একটা শিশুকে রাস্তা থেকে সরানো সাময়িক সমাধান।
এমন পরিস্থিতি তৈরি করা, যাতে তাকে রাস্তায় আসতেই না হয়—সেটাই স্থায়ী সমাধান।
দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়
রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবচেয়ে বড়। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিশুর নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা কোনো দয়া নয়—এগুলো মানুষের অধিকার।
কিন্তু শুধু রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে থাকলেও হবে না।
সমাজের দায়িত্ব আছে। স্কুলের দায়িত্ব আছে। স্থানীয় সংগঠন ও সমাজকর্মীদের দায়িত্ব আছে। আর নাগরিক হিসেবেও আমাদের দায়িত্ব আছে।
একটা শিশুর সঙ্গে আমরা কীভাবে কথা বলি, তাকে সাহায্য করতে না পারলে কীভাবে না বলি, তার ছবি তুলে প্রচার করি কি না—এসব ছোট আচরণ দিয়েও সমাজের চরিত্র তৈরি হয়।
তবে ব্যক্তিগত সাহায্য আর সামাজিক পরিবর্তন এক জিনিস নয়।
একজন মানুষ একজন শিশুকে খাবার দিতে পারেন। কিন্তু হাজার হাজার শিশুর জীবন বদলাতে হলে দরকার সমন্বিত ব্যবস্থা।
কারণ আবেগ দিয়ে একটা দিন পার করা যায়।
একটা প্রজন্ম বদলাতে হলে ব্যবস্থা তৈরি করতে হয়।
শেষ প্রশ্নটা আমাদের নিজেদের
আমরা আমাদের সন্তানদের জন্য কেমন বাংলাদেশ চাই?
এমন বাংলাদেশ, যেখানে তারা নিরাপদে স্কুলে যাবে, খেলবে, স্বপ্ন দেখবে?
নাকি এমন বাংলাদেশ, যেখানে শহরের এক পাশে শিশুদের জন্য স্কুল, খেলার মাঠ ও নিরাপদ ঘর থাকবে, আর অন্য পাশে আরেক দল শিশু ফুটপাতে ঘুমাবে?
আমরা হয়তো নিজেদের জীবনে বাড়ি, টাকা, সম্পদ কিংবা স্মৃতি রেখে যাব।
কিন্তু পরের প্রজন্মের জন্য কী রেখে যাব?
একটা নিরাপদ শৈশব?
একটা ভালো শিক্ষা ব্যবস্থা?
একটা মানবিক সমাজ?
নাকি এমন এক শহর, যেখানে আলো অনেক, কিন্তু কিছু শিশুর রাত এখনো অন্ধকার?
দেশ শুধু মানচিত্রের নাম নয়।
দেশ মানে তার মানুষ।
আর সেই মানুষের মধ্যে ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা শিশুটিও আছে।
সে আমাদের বাইরে কেউ নয়।
সে আমাদেরই ভবিষ্যৎ।
তাই দেশের উন্নয়ন নিয়ে গর্ব করার আগে একবার ফুটপাতের দিকেও তাকানো দরকার।
দেখা দরকার—সেখানে ঘুমিয়ে থাকা শিশুটির জীবনও কি বদলেছে?
যদি বদলে থাকে, তাহলে আমরা সত্যিই এগোচ্ছি।
আর যদি তার জীবন বছরের পর বছর একই জায়গায় পড়ে থাকে, তাহলে আমাদের উন্নয়নের গল্প এখনো অসম্পূর্ণ।
কারণ একটি ভালো দেশের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার উঁচু ভবন নয়।
তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো—সবচেয়ে অসহায় শিশুটিও সেখানে নিরাপদে ঘুমাতে পারে।
আমরা একদিন চলে যাব।
থেকে যাবে আমাদের তৈরি করা সমাজ।
থেকে যাবে আমাদের সিদ্ধান্তের ফল।
তাই শেষ প্রশ্নটা আমাদের নিজেদের কাছেই—
আমরা কেমন বাংলাদেশ রেখে যাচ্ছি?
কারণ আগামী দিনের বাংলাদেশ তৈরি হচ্ছে এখনই—আমাদের নীতি, সিদ্ধান্ত, আচরণ এবং নীরবতার মধ্য দিয়ে।
আর ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা সেই শিশুটিও সেই বাংলাদেশের অংশ।
তার ভবিষ্যৎই আসলে আমাদের ভবিষ্যতের পরীক্ষা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।