যে দরজাটা খোলা ছিল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ২৭ জুন, ২০২৬
ঈদের সকাল। বৃদ্ধাশ্রমের রান্নাঘর থেকে সেমাইয়ের গন্ধ ভেসে আসছে। বারান্দার এক কোণায় বসে আবদুল করিম গেটের দিকে তাকিয়ে আছেন।
সকাল থেকে কতবার যে তাকিয়েছেন, সেটা তিনি নিজেও বলতে পারবেন না।
আজ ভোর থেকেই বৃদ্ধাশ্রমটা অন্য দিনের চেয়ে একটু বেশি ব্যস্ত।
কারণ ঈদে অনেকের পরিবার আসে।
অন্তত আসার কথা থাকে।
বারান্দার অন্য পাশে বসে থাকা রহিমা বেগম সকালে তিনবার শাড়ি বদলেছেন। মেয়ে নাকি বলেছিল, দুপুরের আগেই চলে আসবে।
সামনের ঘরের আজিজ সাহেব কর্মচারীকে দিয়ে দাড়ি ছেঁটে নিয়েছেন। নাতিটা তাকে দাড়ি ছাড়া দেখতে চায় না।
করিম চুপচাপ সব দেখেন।
প্রতি ঈদেই।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যায়। তারপরও অনেক প্রতিশ্রুতি গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢোকে না।
ফজরের নামাজের পরই গোসল করে সাদা পাঞ্জাবিটা পরে নিয়েছেন। গত বছর ছোট ছেলে আমেরিকা থেকে পাঠিয়েছিল। তখন গায়ে বেশ মানিয়েছিল। এখন একটু ঢিলেঢালা লাগে।
করিম এখনও অপেক্ষা করেন।
প্রতি ঈদেই।
আজও।
আজ হয়তো আসবে।
এই ভাবনাটা তিনি প্রতি বছরই ভাবেন। তবু পরের বছর আবারও ভাবেন।
সাড়ে দশটার দিকে গেট খুলে একটা গাড়ি ঢুকল।
করিম অজান্তেই একটু সোজা হয়ে বসলেন।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই আবার আগের মতো হয়ে গেলেন।
গাড়ি থেকে নামল কয়েকজন তরুণ-তরুণী।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের পক্ষ থেকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাতে এসেছে।
তাদের মধ্যে অভিক আর নিশিও ছিল।
নিশির হাতে খাবারের প্যাকেট। অভিক বৃদ্ধাশ্রমের দায়িত্বে থাকা লোকটার সঙ্গে কথা বলছে।
করিম আবার গেটের দিকে তাকালেন।
এমন ভুল তিনি নতুন করেন না।
শুধু ভুলটা এখনও হয়।
অভিক প্রথমে তাকে খেয়াল করেনি।
কিন্তু কিছুক্ষণ পর দেখল, বৃদ্ধ মানুষটা যেন গেটের দিক থেকে চোখ সরাতেই পারছেন না।
সে এগিয়ে গেল।
চাচা, কেমন আছেন?
করিম মুখ তুলে তাকালেন।
ভালো আছি বাবা।
ঈদে কেউ আসবে?
করিম কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
তারপর হেসে বললেন,
আসার কথা ছিল।
অভিক আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
নিশি এসে পাশে বসল।
কথা বলতে বলতে জানা গেল, করিম একসময় স্কুলশিক্ষক ছিলেন।
চল্লিশ বছরের চাকরি। গ্রামের বাড়িটা বিক্রি করতে হয়েছিল ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ জোগাতে।
বড় ছেলে কানাডায়।
ছোট ছেলে আমেরিকায়।
মেয়ে অস্ট্রেলিয়ায়।
সন্তানদের কথা বলতে গিয়ে তার মুখে গর্বের হাসি ফুটে উঠল।
আল্লাহর রহমতে সবাই ভালো আছে।
কথাটা বলে তিনি আবার গেটের দিকে তাকালেন।
দুপুরে সবাই মিলে খাওয়াদাওয়া করল।
করিমকে অন্য দিনের চেয়ে একটু বেশি কথা বলতে দেখা গেল।
স্কুলের গল্প বললেন।
ছাত্রদের গল্প বললেন।
একজন ছাত্রের কথা বললেন, যে এখন বড় ডাক্তার।
হঠাৎ নিশি খেয়াল করল, করিম নিজের প্লেটের মাংসের টুকরোটা ছুঁয়েও দেখেননি।
খাচ্ছেন না কেন?
করিম মৃদু হেসে বললেন,
আমার নাতিটা মাংস খুব পছন্দ করে। ভিডিও কলে কথা হলে সব সময় প্লেট দেখাতে বলে। আজ ওর কথা মনে পড়ে গেল।
এরপর আর কিছু বললেন না।
মাংসের টুকরোটা প্লেটের এক কোণায় পড়ে রইল।
বিকেলের দিকে একে একে কয়েকজনের পরিবার এল।
কেউ ফুল নিয়ে এসেছে।
কেউ বাড়ির রান্না।
কেউ নাতি-নাতনিকে নিয়ে ছবি তুলছে।
রহিমা বেগমের মেয়ে শেষ পর্যন্ত এল না।
আজিজ সাহেবের নাতিটাও না।
করিম দূর থেকে সব দেখছিলেন।
মুখে ছোট্ট একটা হাসি ছিল।
খাওয়ার পর অভিক বলল,
চাচা, একটা ছবি তুলতে পারি?
করিম হেসে বললেন,
এই বুড়ো মানুষের ছবি রেখে কী হবে?
ভালো লাগবে।
তাহলে তো তুলতেই হয়।
ছবি তোলার সময় তিনি ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে হাসলেন।
বিকেলের দিকে অভিক আর নিশি বিদায় নিতে এলে করিম বললেন,
আবার আসবা তো?
আসব চাচা।
নিশি উত্তর দিল।
অভিকও বলল,
ইনশাআল্লাহ আসব।
করিম শুধু মাথা নাড়লেন।
সন্ধ্যার একটু আগে তার ফোন বেজে উঠল।
ছোট ছেলে।
অনেক দিন পর।
কথা হলো।
কাজের কথা।
নাতনির স্কুলের কথা।
আবহাওয়ার কথা।
শেষে ছেলেটা বলল,
বাবা, আগামী ঈদে চেষ্টা করব আসতে।
করিম একটু চুপ করে থেকে বললেন,
আচ্ছা বাবা।
এই কথাটাও তিনি আগেও শুনেছেন।
একবার না।
অনেকবার।
ফোন রাখার আগে শুধু বললেন,
ভালো থাকিস।
ওপাশ থেকে ভেসে এল,
তুমিও ভালো থেকো।
কল কেটে গেল।
বারান্দায় আবার নীরবতা নেমে এল।
দূরে কোথাও আতশবাজির শব্দ হচ্ছিল।
করিম ধীরে ধীরে নিজের ঘরের দিকে হাঁটলেন।
করিডোরের দেয়ালে ঝোলানো ছবিগুলোর দিকে চোখ গেল।
কিছু ছবির নিচে ছোট্ট কালো ফিতা বাঁধা।
যারা একদিন এই বারান্দায় বসে গেটের দিকে তাকিয়ে থাকতেন, তারা আর নেই।
দরজার কাছে গিয়ে তিনি একবার পেছনে তাকালেন।
গেটটা তখনও খোলা।
কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে থেকে ভেতরে ঢুকে দরজাটা আস্তে করে টেনে দিলেন।
গেটটা অবশ্য তখনও খোলা ছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।