অন্ধকারের দংশন
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ২৪ জুলাই, ২০২৬
রাত তখন শেষ প্রহর ছাড়ে ছাড়ে। গ্রামের উত্তর পাড়ার বুড়ো বটগাছটার ঝুড়ি বেয়ে যেন কুয়াশার অন্ধকার নেমে এসেছে নিচে। মাতবরের বড় ছেলে রাজু যখন উঠানে গোঙাতে গোঙাতে ঢুকল, তখন তার ডান পায়ের গোড়ালির ঠিক ওপরে দুটো রক্তের লাল দাগ। দাগ দুটোর চারপাশে চামড়া ততক্ষণে কালো মারতে শুরু করেছে।
কাঁচা বাঁশের ঝোপের পাশ দিয়ে হাঁটার সময় বিষাক্ত গোখরোটা থাবা বসিয়েছিল রাজুর পায়ে। বাড়িতে হুলস্থুল পড়ে গেল। কান্নাকাটি আর চেঁচামেছিতে তল্লাটের মানুষ জড়ো হতে বেশি সময় লাগল না। গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ মুরুব্বি জলিল শেখ ভিড় ঠেলে সামনে এসে হাঁক দিলেন, "ওরে, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিস কী? জলদি গহীনপুরের করিম ওঝাকে খবর দে! বিষ তো মাথা চড়ে যাবে!"
বাড়ির ছোট ছেলে, রাজুর ছোট ভাই সোহেল ভিড় ঠেলে এগিয়ে এলো। ও সদরের কলেজে পড়ে। রাজুর পা দেখে সোহেলের চেহারা ফ্যাকাশে হয়ে গেল। ও চেঁচিয়ে উঠল, "কিসের ওঝা? তোমরা কি পাগল হয়েছ? ওকে এখনই গঞ্জের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে! সাপে কেটেছে, অ্যান্টিভেনম না দিলে আধ ঘণ্টার মধ্যে বিষ রক্তে ছড়িয়ে পড়বে!"
কিন্তু সোহেলের কথা শুনল কে? জলিল শেখ চোখ কপালে তুলে বললেন, "রাখ তোর হাসপাতালের গপপো! আমাদের এই তল্লাটে বাপ-দাদার আমল থেকে করিম ওঝাই সাপের বিষ নামায়। ওঝার তেলপড়া আর মন্ত্রের জোরে কত জ্যান্ত মরা বেঁচে উঠেছে, তার হিসেব আছে? ডাক্তাররা আবার সাপের বিষের কী বোঝে?"
গ্রামের অন্ধ কুসংস্কার আর বয়স্কদের জেদের সামনে একাই লড়ছিল সোহেল। মাতবর নিজেও তখন ভয়ে দিশেহারা। তিনি ছেলের কাতরানো দেখে সিদ্ধান্ত হারিয়ে ফেলেছেন। সোহেলকে ধমকে থামিয়ে দেওয়া হলো। চট জলদি গহীনপুর থেকে ডেকে আনা হলো করিম ওঝাকে।
ওঝা এল তার দলবল নিয়ে। সাথে নিমের ডাল, মারণ মন্ত্র আর কাঁসার থালা। এসেই সে বিশাল এক ভাব নিয়ে রাজুর পায়ের ওপর নিমের ডাল বোলাতে শুরু করল। বিড়বিড় করে পড়তে লাগল হিজিবিজি কিছু মন্ত্র। কিছুক্ষণ পর রাজু যখন ব্যথায় চিৎকার করে উঠে নিস্তেজ হয়ে পড়তে লাগল, তখন ওঝা শান্ত গলায় বলল, "ভয় পাওয়ার কিছু নেই, বিষ নিচের দিকে নামছে। ভেতরে কাঁচা তেল আর মন্ত্র পড়া পানি দাও।"
ওঝার প্রতিটা মন্ত্রপাঠের সাথে সাথে ঘড়ির কাঁটা নিঃশব্দে পেরিয়ে যাচ্ছিল। ১০ মিনিট, ২০ মিনিট, ৪০ মিনিট... সাপের মারাত্মক নিউরোটক্সিক বিষ ততক্ষণে রাজুর রক্তনালী বেয়ে স্নায়ুতন্ত্রকে অবশ করতে শুরু করেছে। রাজুর চোখ দুটো বুজে আসতে লাগল, নিশ্বাস ভারী হয়ে এলো।
সোহেল বারবার হাতে-পায়ে ধরে কাঁদছিল, "বাবা, ভাইয়া কিন্তু আর বাঁচবে না! আমাকে একটা গাড়ি ডেকে দাও, আধ ঘণ্টার পথ, হাসপাতালে নিয়ে যাই!" কিন্তু গ্রামের মানুষজন তখন ওঝার অলৌকিক ক্ষমতার আশায় মন্ত্রের দিকে তাকিয়ে। করিম ওঝা তখন গলার রগ ফুলিয়ে চেঁচাচ্ছে আর ধূপের ধোঁয়া দিয়ে ঝাড়ফুঁক করছে।
প্রায় পৌনে দুই ঘণ্টা পর, যখন রাজুর দেহটা কাঠের মতো শক্ত হয়ে এলো, ঠোঁট থেকে গ্যাঁজলা বের হতে শুরু করল এবং সারা শরীর নীল হয়ে গেল, ঠিক তখন করিম ওঝা কপালে হাত দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। থমথমে গলায় বলল, "বড্ড দেরি হয়ে গেছে গো মাতবর সাহেব! যে সাপে কেটেছে, সে সাধারণ সাপ নয়—ওটা কালনাগিনী। সাপটা বিষ নয়, রাজুর আত্মাটাই টেনে নিয়ে গেছে। এতে আমার মন্ত্র কাজ করবে না।"
কথাটা বলেই ওঝা তার সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে সটান সটকে পড়ল।
পুরো উঠান এক মুহূর্তে থমথমে হয়ে গেল। এতক্ষণে মাতবরের হুঁশ ফিরল। তিনি কান্নায় ভেঙে পড়ে বললেন, "ওরে সোহেল, তোর কথাই ঠিক! জলদি ভ্যান ডাক, আমার ছেলেকে হাসপাতালে নিয়ে চল!"
কিন্তু তখন যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। ভ্যানে করে যখন রাজুকে গঞ্জের সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো, জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত ডাক্তার রাজুর চোখ ও নাড়ী পরীক্ষা করলেন। স্টিথোস্কোপটা কানে দিয়ে কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন ডাক্তারবাবু। তারপর ধীরস্বরে, কিছুটা আক্ষেপ আর ক্ষোভ নিয়ে বললেন, "আপনারা মানুষটাকে নিয়ে এলেন, নাকি একটা লাশ নিয়ে এলেন?"
মাতবর ডাক্তারের পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন, "ডাক্তারবাবু, আমার রাজুকে বাঁচান! দরকার হলে সব জমি বিক্রি করে দেব!"
ডাক্তার বিরক্তি আর কষ্টে মাথা নাড়ালেন। বললেন, "টাকা দিয়ে এখন আর কী করবেন মাতবর সাহেব? সাপে কাটার পর প্রথম এক থেকে দুই ঘণ্টা হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যাকে আমরা 'গোল্ডেন আওয়ার' বলি। ওই সময়ে একটু অ্যান্টিভেনম দিলে এই ছেলেটা আজ দিব্যি হেঁটে বাড়ি ফিরত। আপনারা করলেন কী? ওঝার ঘরে অমূল্য সময়টুকু নষ্ট করে মানুষটাকে মারার ব্যবস্থা করলেন! এখন আর আমাদের করার কিছুই নেই।"
জরুরি বিভাগের সেই ঠান্ডা ঘরটায় মাতবরের হাহাকার আর ডুকরে কেঁদে ওঠার শব্দটা বাতাসকে ভারী করে তুলল। কিন্তু সেই কান্নায় রাজুর বন্ধ হওয়া নিশ্বাস আর ফিরে এলো না।
গ্রামের রাস্তায় যখন রাজুর নিষ্প্রাণ দেহটা ভ্যানে করে ফিরিয়ে আনা হচ্ছিল, সোহেল তখন শুধু কুয়াশাচ্ছন্ন আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল—রাজুকে তো সাপে কাটেনি, রাজুকে মেরে ফেলেছে শত বছরের পুরোনো সেই অন্ধকার অন্ধবিশ্বাস আর মানুষের মূঢ়তা। যে ভুল আর সামাজিক কুসংস্কার প্রতিদিন কত শত তাজা প্রাণ অকালে কেড়ে নেয়, তার আর কোনো শেষ নেই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।