বর্ষার আলোয় চুপচাপ
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২৬
বিকেল থেকে বৃষ্টি। টিনের ছাদে প্রথমে টুপটাপ, তারপর একটানা শব্দ—যেন কেউ আঙুল দিয়ে পুরোনো সুর বাজাচ্ছে। করিডোরে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ জমে আছে। নীল পর্দা হাওয়ায় ফুলে ওঠে, আবার নুয়ে পড়ে। রান্নাঘরের চুলোর আগুন হঠাৎ কেঁপে ওঠে। নিশি হাত বাড়িয়ে আগুনটা ঠিক করে, তারপর আবার থেমে যায়—কী যেন ভুলে গেছে মনে হয়, কিন্তু মনে পড়ে না।
চা বসিয়েছে সে। কেটলি কাঁপছে। হাতও।
এক কাপের চিনি মেপে দিল। অন্যটায় অভ্যাস মতোই একটু বেশি পড়ে গেল। খেয়াল হলো না।
ঘর থেকে অভিক বলল,—চিনি কম দিও।
নিশি উত্তর দিল না। শুধু কাপ দুটো ট্রেতে রেখে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইল একটু। যেন ভেতরে ঢোকার আগে অনুমতি চাইছে।
বৃষ্টি ঘন হলো। হঠাৎ আলো নিভে গেল। ঘর অন্ধকার। নিশি ড্রয়ার খুলতে গিয়ে হাত পড়ল একটা পুরোনো চশমায়। অভিকের। ফেলে দেওয়ার কথা ছিল বহুদিন। ফেলা হয়নি।
মোম জ্বালতেই ঘর ছোট হয়ে এলো। দেয়ালে ঝোলানো ছবিগুলো হলদে আলোয় অন্যরকম লাগে—অচেনা মানুষের মতো। একটায় নিশির হাসি। সে তাকিয়ে থাকে। মনে হয়, মেয়েটা কে?
অভিক দরজায় এসে দাঁড়াল।—জেনারেটরটা আবার নষ্ট?—মনে হয়।
দুজনেই জানে, এই বাড়িতে জেনারেটর নেই।
টেবিলে চা। বাইরে বৃষ্টি। ভেতরে মোম। অভিক কাপ তুলে চুমুক দিল। মুখ কুঁচকাল না। কিছু বলল না। নিশি তাকিয়ে দেখল, সে ধীরে ধীরে সবটুকু খেয়ে ফেলছে।
নিশি আলমারি খুলে অ্যালবাম বের করল। ধুলো মুছতে গিয়ে হাঁচি দিল। অভিক এগিয়ে এসে কাপড়টা নিয়ে নিল, নিজেই মুছতে লাগল।
প্রথম পাতা—বিয়ের দিন। নিশির চুলে লাল ফুল। অভিকের লাজুক হাসি। পেছনে ঝাপসা আলো।
অভিক বলল,—এই ফুলটা তুই নিজে লাগিয়েছিলি।
—তুই কিনে এনেছিলি।
—আমি দামাদামি করতে পারিনি।
একটু হাসি হলো। ছোট। শুকনো। কিন্তু হাসি।
পাতা উল্টাল। সমুদ্র। নিশির ওড়না উড়ছে, অভিক পেছন থেকে ধরে আছে। আরেক পাতা—স্টেশন প্ল্যাটফর্ম। চা-ওয়ালার ভাঁপ উঠছে।
আরেকটা—হাসপাতাল।
নিশি থেমে গেল। ছবিটা পুরোপুরি খোলা হয়নি। কোণায় সাদা বিছানা দেখা যায়, গোলাপি কম্বল ভাঁজ করা।
অভিক ধীরে বলল,—আরশি থাকলে আজ সাত বছর হতো।
নিশি মাথা নাড়ল। কথা বের হলো না। শুধু ছবিটার ওপর আঙুল রেখে থাকল। যেন কেউ ঘুমাচ্ছে, জাগিয়ে দিতে চাইছে না।
বাইরে বৃষ্টি তখন আরেকটু জোরে। টিনের ছাদে শব্দ বদলে গেছে—ধাতব, ভারী।
—ঔষধ খেয়েছ? অভিক জিজ্ঞেস করল।
—খেয়েছি।
অভিক জানে, মিথ্যে। তবু আর কিছু বলল না। শুধু হাত বাড়িয়ে নিশির পাশে রাখা পানির গ্লাসটা এগিয়ে দিল।
মোমের আলো কেঁপে উঠছে।
নিশি বলল,—সেদিন তুই কিছু বলিসনি।
অভিক চুপ। তারপর বলল,—বলতে পারিনি। ভয় পেয়েছিলাম। যদি বলি, সত্যি হয়ে যায়।
নিশি ধীরে বলল,—আমিও।
তারা প্রথমবার চোখে চোখ রাখল। অনেক বছর পর মনে হলো, দুজনেই একে অপরকে নতুন করে দেখছে।
অ্যালবামের ভেতর থেকে একটা ভাঁজ করা কাগজ পড়ে গেল। প্রেসক্রিপশন। শিশুটার নাম লেখা—আরশি।
নিশি কাগজটা তুলে নিল।—ফেলে দেব?
অভিক বলল না। শুধু হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিল, ভাঁজ করল, আবার অ্যালবামের ভেতর রেখে দিল।
—থাক। থাকলে দোষ কী?
বৃষ্টি একটু নরম হলো। ঘরে শুধু মোমের আলো আর বৃষ্টির গন্ধ।
নিশি হাতপাখা তুলে অভিকের দিকে বাতাস করল।
—গরম লাগছে?
—না। তোর লাগছে।
—আমার লাগে না।
অভিক হাসল।—মিথ্যে।
নিশি থামল না। পাখা দুলতেই থাকল।
কিছুক্ষণ পর অভিক বলল,—আমার উচিত ছিল সেদিন তোকে জড়িয়ে ধরা।
নিশি মাথা নাড়ল।—আমার উচিত ছিল কাঁদা। তোর সামনে।
দুজনেই জানে, তারা তখন একে অপরের পাশেই ছিল, তবু আলাদা।
মোম শেষ হয়ে এল। আলো নিভে গেল। অন্ধকারে নিশি অভিকের কাঁধে মাথা রাখল। অভিক একটু দেরি করে হাত তুলল, তারপর নিশির মাথায় রাখল—সাবধানে, যেন কাচ।
দূরে ট্রান্সফরমারের শব্দ হলো। আলো ফিরে এলো।
ঘর আবার পরিচিত। অ্যালবাম টেবিলে খোলা। প্রেসক্রিপশন দেখা যাচ্ছে।
নিশি বলল,—কাল ছুটি নেবি?
—কেন?
—ডাক্তার দেখাব। আবার চেষ্টা না করলেও… কথা বলতে চাই।
অভিক একটু চুপ থেকে বলল,—নেব।
জানালা খুলে দিল নিশি। ঠান্ডা বাতাস ঢুকল। ভেজা গন্ধে ঘর ভরে গেল।
রাতে তারা দুই পাশে মুখ করে শুল। মাঝখানে দূরত্ব। কিছুক্ষণ পর অভিক হাত বাড়াল। নিশির আঙুল ছুঁল। নিশি আঙুল চেপে ধরল। কেউ কথা বলল না।
সকালে বৃষ্টি থেমেছে। ধূসর আলো। নিশি আবার চা বানাল। এক কাপের চিনি মেপে দিল। অন্যটায় ভুলে বেশি পড়ে গেল।
অভিক কাপ হাতে নিয়ে বলল,—চিনি বেশি।
নিশি মাথা নিচু করল।—আবার বানাব?
অভিক মাথা নাড়ল।—না। এভাবেই খাব।
চুমুক দিল। ধীরে। যেন ভুলটুকু মুছে ফেলতে চায় না।
ল্যাপটপ খুলে অভিক নতুন ফাইল লিখল—“শেষ বর্ষা”।
একটু ভেবে লিখল—“আমরা সন্তান হারিয়েছি।
কিন্তু আমরা একে অপরকে পুরোপুরি হারাইনি।”
সে থামল। নিশির দিকে তাকাল। নিশি জানালা দিয়ে বৃষ্টির পরের আকাশ দেখছে।
দুজনেই পাশাপাশি বসে রইল।
কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
কোনো নাটক নেই।
শুধু ভুল চায়ের কাপ, অ্যালবামের ভাঁজে রাখা একটি নাম, আর বৃষ্টির পরে ভেজা আলো।
হয়তো সব ঠিক হবে না। তবু তারা উঠল না।
একটু আর বসে থাকল।
#অব্যক্তপ্রেম #অভিকনিশি #বর্ষারগল্প #দাম্পত্যবাস্তবতা #নীরবভালোবাসা #বাংলাছোটগল্প #জাহিদলেখে
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।