মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ২৯ জুলাই, ২০২৬
একটি শিশুকে বড় করে তোলে শুধু একটি পরিবার নয়, তার চারপাশের পুরো পৃথিবীটাও।
অভিক মনে-প্রাণে বিশ্বাস করত, সন্তানকে ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্বটা পুরোপুরি বাবা-মায়ের। তাই নিজের দুই সন্তানের জন্য তার চেষ্টার কোনো কমতি ছিল না। ভালো স্কুল, ভালো বই, নিয়ম করে পড়াশোনা — যা যা দরকার, সবকিছুই সে আগলে রেখেছিল। তার ধারণা ছিল, এভাবেই সন্তানের ভবিষ্যতের ভিতটা মজবুত হয়।
কিন্তু একটা ছোট ঘটনা তার এই বিশ্বাসটাকে নাড়িয়ে দিল।
অভিকের ছেলে রায়ান তখন ক্লাস সিক্সে পড়ে। শান্ত, চুপচাপ স্বভাবের ছেলে। পড়াশোনায় ভালো, কারও সঙ্গে ঝগড়া-বিবাদে নেই।
এক বিকেলে স্কুল থেকে ফিরে রায়ানকে খুব চুপচাপ লাগছিল। ব্যাগটা রেখে সে জানালার পাশে গিয়ে বসল, কোনো কথা বলছে না।
অভিক কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
— কী হয়েছে বাবা?
রায়ান কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
— আমাদের ক্লাসে একটা ছেলেকে সবাই নিয়ে হাসাহাসি করে। কেউ ওর পাশে বসতে চায় না।
অভিক বলল,
— তুমি কিছু বলোনি?
রায়ান মাথা নিচু করে আস্তে করে বলল,
— সবাই যখন হাসে, তখন একা একা কিছু বলতে খুব ভয় লাগে।
ছেলের এই কথাটা শুনে অভিক আর কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার মনে হলো, ছেলেকে ঘরে বসে ভালো কথা শেখালেই তো দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। সে যে পরিবেশে বড় হচ্ছে, সেই পরিবেশটাও তো সমান গুরুত্বপূর্ণ।
পরদিন সকালে অভিক স্কুলে গেল। ক্লাস টিচারের সঙ্গে দেখা করে সবটা খুলে বলল।
সব শুনে শিক্ষক বললেন,
— দেখুন, একটা বাচ্চা বাড়িতে এক রকম শেখে। কিন্তু বাইরে এসে যদি তার উল্টোটা দেখে, তখন সে দ্বিধায় পড়ে যায়। ও বুঝতে পারে না কোনটা ঠিক। তাই শুধু পরিবার বা শুধু স্কুল — একা কারও পক্ষেই এই দায়িত্ব সামলানো সম্ভব না।
কথাটা অভিকের মনে গভীরভাবে গেঁথে গেল।
এরপর সে কয়েকজন অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলল। সবাই মিলে স্কুলে একটা ছোট আলোচনার ব্যবস্থা করলেন। সেখানে ঠিক হলো, কেউ কাউকে নিয়ে হাসলে বা কাউকে একা করে দিলে শুধু শাস্তি দেওয়া হবে না, কেন এই আচরণটা ভুল, সেটাও সবাইকে বুঝিয়ে বলা হবে।
পরিবর্তনের হাওয়াটা পাড়াতেও এসে লাগল। বিকেল বেলা খেলার মাঠটা পুরোপুরি বাচ্চাদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হলো। পাড়ার বড়রা নিজেরাও খেয়াল রাখতে শুরু করলেন, যাতে তাদের কোনো আচরণ ছোটদের সামনে খারাপ উদাহরণ হয়ে না দাঁড়ায়।
পরিবর্তনটা এল, তবে খুব ধীরে ধীরে।
কয়েক দিন পরের ঘটনা। অভিক ছেলেকে আনতে স্কুলে গেছে। জানালা দিয়ে ক্লাসের ভেতর তাকিয়ে দেখল, রায়ান সেই ছেলেটার পাশেই বসে আছে, যাকে সবাই এড়িয়ে চলত।
বাড়ি ফিরে অভিক জিজ্ঞেস করল,
— আজ ওর পাশে বসেছিলে?
রায়ান হেসে বলল,
— শুধু আমি না, বাবা। আরও কয়েকজন বসেছে। আমরা এখন একসঙ্গে টিফিন খাই।
এই কথা শুনে অভিকের মুখেও নিজের অজান্তে হাসি ফুটে উঠল।
সেদিন সে বুঝতে পারল, একজন আন্তরিক শিক্ষক চাইলে একটা ক্লাসরুম বদলে দিতে পারেন। কয়েকজন সচেতন বাবা-মা চাইলে একটা স্কুলের পরিবেশ বদলে দিতে পারেন। আর সেই বদলে যাওয়া সুন্দর পরিবেশটাই একটু একটু করে বদলে দেয় একটা শিশুর মন।
সন্তানকে মানুষ করার কাজটা ঘরের চৌকাঠে এসে শেষ হয়ে যায় না।
সে যখন ঘরের বাইরে পা রাখে, তখন তার শিক্ষক, তার বন্ধু, তার প্রতিবেশী, তার খেলার মাঠ — সবাই মিলে একটু একটু করে তার ভেতরের মানুষটাকে গড়ে তোলে।
তাই একটা শিশুর জন্য সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে চাইলে শুধু নিজের সন্তানের দিকে তাকালেই চলে না।
চারপাশের প্রতিটি শিশুর জন্যই আমাদের একটু একটু করে দায়িত্ব নিতে হয়।
কারণ, একটি শিশুর বেড়ে ওঠা কখনোই শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়, এটি পুরো সমাজের গল্প।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।