ভালোবাসার স্রোত
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ফেব্রুয়ারি ১২, ২০২৬
ফেব্রুয়ারির দুপুরে শহরের বাতাসে একটা কৃত্রিম উষ্ণতা লেগে থাকে। রাস্তায় পলিথিনে মোড়া গোলাপ, মোড়ে মোড়ে কাগজের হৃদয়, আর ভাজা পিঁয়াজুর গন্ধ—সব মিলিয়ে যেন অভিককে অপেক্ষায় বসিয়ে রেখেছে। সে কলেজ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল, হাতে ফোন, স্ক্রিন নিভে। সময় দেখছিল না; শুধু অপেক্ষা।
দশ মিনিট পরে নিশি এল। চুল এলোমেলো, ঠোঁট চেপে ধরা। “গাড়ি পেলাম না।” অভিক জানত—নিশি বিরক্ত হলে বাস ছেড়ে দেয়, অকারণে হাঁটে, তারপর নিজেকেই দোষ দেয়। সে কিছু বলল না। শুধু বলল, “চলো, হাঁটি।”
নদীর দিকে যাওয়ার রাস্তা গাছপালা থাকলেও ছায়া কম। ডাল শুকনো, মাঝে মাঝে বাতাসে শুকনো পাতা ঘুরে আসে। হাঁটতে হাঁটতে নিশি চুল বাঁধতে গিয়ে ক্লিপ খুলল—বাঁ হাত হালকা কাঁপছিল। অভিক তাকিয়ে রইল। এই কাঁপুনি কি নতুন? নাকি এতদিন সে খেয়াল করেনি? খেয়াল না করারও তো একটা অভ্যাস হয়।
পথে এক চোখে ছানি পড়া কালো কুকুর। নিশি পাশ কাটিয়ে গেল। অভিক থামল এক মুহূর্ত। কুকুরটা অন্য দিকে তাকিয়ে আছে—যেদিকে কিছু নেই। অভিকের হঠাৎ মনে হলো, না-দেখারও আলাদা দিক থাকে।
নদীর পাড়ে পৌঁছে তারা বসল। ভাঙা কংক্রিটের সিঁড়ি। ফাঁকে ফাঁকে ঘাস। পাশের এক ব্যক্তি বোতল খুলে নদীর দিকে তাকাল, আবার সরে গেল। নদী ধীরে বয়ে যাচ্ছে। জলে ভাসছে কাগজ, কাচের টুকরো রোদে ঝিলিক দিচ্ছে।
“তুমি কি আমার কথা শোনো এখন?” নিশি নদীর দিকে তাকিয়ে বলল।
অভিক উত্তর দেওয়ার আগে ভাবল—সে কি সত্যিই শোনে? সে কি শুনেছে নিশির সাম্প্রতিক চুপচাপ থাকা? কি খেয়াল করেছে, নিশি আগের মতো হঠাৎ গল্প শুরু করে না?
“শুনি,” সে বলল।
“কী শুনো?”
অভিকের মাথায় এল—“সব শুনি”, “তুমি বললেই শুনি”—কিন্তু এগুলো আসলে উত্তর নয়। সে চুপ করে রইল, হাতে কাঁপা লক্ষ্য করল, কথায় নয়। নদীর ঢেউ তাদের পা স্পর্শ করছে, যেন প্রতিটি স্রোতের সঙ্গে মিলছে অভিকের ধীরস্বরে হ্রদয়স্পন্দন।
একটা লঞ্চ গেল। ঢেউ এসে সিঁড়িতে লাগল। পানি ছিটকে উঠল সামান্য। মাঝি তাকাল, আবার মুখ ফিরিয়ে নিল। নদী কাউকে নিয়ে ব্যস্ত নয়।
“আমরা এখন কী করি?” নিশি বলল।
“কী মানে?”
“যখন বুঝি কিছু ঠিক নেই—তখন মানুষ কী করে?”
অভিক জানে না মানুষ কী করে। সে জানে শুধু তারা কী করছে—পাশাপাশি বসে আছে, কিন্তু হাত ধরছে না। আঙুল আলাদা আলাদা কংক্রিটে ঘষছে।
কয়েক মাস আগে তারা এখানে এসেছিল। তখন হালকা বৃষ্টি। নিশি চা খেতে জেদ করেছিল। হাত তখন কাঁপেনি। অভিক মনে করার চেষ্টা করল—ওই বিকেলটা ঠিক কতদিন আগে? তিন মাস? চার? স্মৃতি সময় মাপে না; কেবল অনুভূতি রেখে যায়।
“তুমি কি খুশি?” নিশি জিজ্ঞেস করল।
প্রশ্নটা সরাসরি। খুশি—শব্দটা সহজ, উত্তর কঠিন। অভিক ভাবল—সে কি খুশি? নাকি শুধু অভ্যস্ত?
“জানি না,” সে বলল। এবার সত্যি করে।
নিশি হাসল। অদ্ভুত হাসি—যেন কারও দিকে না তাকিয়ে। এক চোখে ছানি পড়া কুকুরের মতো।
“তুমি কখনও জানো না,” সে বলল। “এটাই সমস্যা।”
অভিক প্রতিবাদ করল না। সে জানে—প্রায়ই সে অপেক্ষা করে পরিস্থিতি নিজে ঠিক হয়ে যাবে। কথা বলে না, ভাবতে থাকে। ভাবতে ভাবতেই দূরত্ব তৈরি হয়।
আকাশে নামহীন রঙ—ধূসরও না, গোলাপিও না। আলো কমছে, কিন্তু পুরো অন্ধকার নয়। মধ্যবর্তী সময়টাকে সে সবসময় অসহ্য মনে করে। নিশি উঠে দাঁড়াল। জুতোর পাশে কাদা লেগেছে। সে দেখল না। অভিক দেখল, বলল না। বললে হয়তো নিশি হেসে বলত, “তুমি এসব খেয়াল করো।”
“চলো,” নিশি বলল।
“কোথায়?”
“ফিরি।”
ফিরে যাওয়ার ভেতরেও এক ধরনের স্বীকারোক্তি থাকে।
তারা হাঁটতে লাগল। এক দোকানে চা পড়ছিল। অভিক থামতে চাইল। মনে হলো—চা খেলে হয়তো কথাটা অন্য দিকে যেত। কিন্তু নিশি থামল না। সে-ও থামল না।
হাঁটতে হাঁটতে অভিক বুঝল—সে নিশিকে ভালোবাসে, কিন্তু হয়তো সেই নিশিকে, যে ছিল। মানুষ বদলায়। ভালোবাসা বদলায়। তারা কি সেই বদল মেনে নিতে পেরেছে?
বাসায় ফিরে অভিক ফোন হাতে নিল। বার্তা লিখল—মুছে দিল। আবার লিখল:
“আজ তোমার হাত কাঁপছিল।”
অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল। পাঠাল না।
রাতটা ঘুমহীন কেটে গেল। জানালা দিয়ে দূরের আলো দেখা যায়। শহর থামে না। নদীও না।
নদী ছিল।
স্রোত ছিল।
দুজন মানুষ সরে গেছে। তবে ভালবাসার স্পন্দন চিরকাল বয়ে চলে।
অভিক প্রথমবার স্বীকার করল—ভালোবাসা সবসময় শেষ হয় না। কখনও তা শুধু অন্য দিকে বয়ে যায়। আর মানুষ দাঁড়িয়ে থাকে পুরোনো ঘাটে, ভাবতে থাকে—স্রোত কি বদলেছে, নাকি সে নিজেই।
ফোনের স্ক্রিন নিভে গেল।
নদী ছিল।
স্রোত ছিল।
#ভালোবাসারস্রোত
#মোহাম্মদজাহিদহোসেন
#সমকালীনছোটগল্প
#মনস্তাত্ত্বিকবাস্তবতা
#নীরববিচ্ছেদ
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।