অনিশ্চয়তার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা দিনগুলো
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। মে ০৪, ২০২৬
বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটের সামনে দাঁড়িয়ে রিয়ান অনেকক্ষণ ধরে শুধু মানুষের চলাচল দেখছিল। কেউ দ্রুত পেরিয়ে যাচ্ছে, কেউ ফোনে কথা বলতে বলতে হেসে উঠছে, কেউ আবার কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে এমনভাবে হাঁটছে যেন দিনটা তার জন্য শুধু এক ধরনের বাধ্যবাধকতা। দৃশ্যটা নতুন কিছু নয়, কিন্তু অদ্ভুতভাবে তার ভেতরের প্রতিক্রিয়াটা প্রতিবারই আলাদা লাগে—কখনো ভারী, কখনো নিস্তেজ।
এই প্রশ্নটা তার মাথায় বারবার ফিরে আসে—সে কি কোনো পথে আছে, নাকি পথের ধারণাটাই ধীরে ধীরে তার কাছ থেকে সরে যাচ্ছে?
ক্লাস শেষে বন্ধুরা চায়ের দোকানে বসে। সবার কথায় একটা নির্দিষ্ট গন্তব্যের ইঙ্গিত আছে—কেউ বিদেশে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, কেউ ইন্টার্নশিপ নিয়ে ব্যস্ত, কেউ ভবিষ্যতের পরিকল্পনা গুছিয়ে বলছে। রিয়ান তাদের কথা শোনে, মাঝেমধ্যে মাথা নাড়ায়, কিন্তু তার ভেতরে একটা চাপ জমে থাকে, যেটা সে ভাষায় আনতে পারে না।
এক বন্ধু হেসে বলে,
—“তুই তো সবসময় এমন শান্ত, তোর কোনো টেনশনই নাই নাকি?”
রিয়ান একটু থেমে উত্তর দেয়,
—“চুপ থাকা কি সবসময় শান্ত থাকার মানে হয়?”
কথাটা শেষ করেই সে নিজেই একটু থামে। উত্তরটা তার নিজের কাছেও পুরোপুরি পরিষ্কার না।
বাড়ি ফিরে সে জানালার পাশে বসে থাকে। বাইরে রাস্তায় আলো জ্বলছে, মানুষ ফিরছে নিজের গন্তব্যে। তার মনে পড়ে শৈশবের কথা—তখন মনে হতো বড় হলেই সব স্পষ্ট হয়ে যাবে। এখন সেই “স্পষ্ট” ধারণাটাই তার কাছে কিছুটা ভঙ্গুর মনে হয়, যেন অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস থেকে তৈরি হওয়া এক ধরনের অনুমান ছিল।
মা একদিন বলেছিলেন,—“সবাই একসাথে সব বুঝে যায় না, বোঝাটা ধীরে ধীরে আসে।”
তখন কথাটা খুব সাধারণ মনে হয়েছিল। এখন সেটা অন্যভাবে শোনায়—কম সরল, বেশি বাস্তবসম্মত।
পরের দিন ক্যাম্পাসে একটি সেমিনারে সে একজন সিনিয়রের কথা শোনে। সিনিয়র বলছিল, নিশ্চিততার অভাবকে সরাসরি ব্যর্থতা হিসেবে না দেখলেও চলে; বরং সেটাকে সম্ভাবনার জায়গা হিসেবে ভাবা যেতে পারে। রিয়ান পুরোপুরি একমত হতে পারে না, আবার পুরোপুরি অস্বীকার করতেও পারে না। তার মনে হয়, অনিশ্চয়তা শুধু একটি মানসিক অবস্থা না, বরং একই সঙ্গে একটা চাপের নামও।
রাতে সে নিজের খাতায় কিছু শব্দ লেখে—পড়া, কাজ, ভবিষ্যৎ, লক্ষ্য। প্রতিটি শব্দের পাশে প্রশ্নচিহ্ন বসে যায়, যেন ভাষার ভেতরেই সন্দেহ ঢুকে পড়েছে।
তার মনে হয়, এই দ্বিধা শুধু তার একার নয়। আশেপাশের অনেক তরুণের ভেতরেই একই ধরনের অস্থিরতা আছে, যদিও তারা সেটা ভিন্নভাবে প্রকাশ করে বা ঢেকে রাখে।
কিছুদিন পর ক্যাম্পাস লাইব্রেরিতে বসে থাকা অবস্থায় তার এক পুরনো শিক্ষক এসে পাশে বসেন। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলেন,
—“তুমি খুব বেশি ভাবো। সব প্রশ্নের উত্তর এখনই খুঁজে পাওয়ার দরকার নেই।”
রিয়ান একটু সময় নিয়ে উত্তর দেয়,—“না জানলে এগোনো যায় কীভাবে?”
শিক্ষক হালকা স্বরে বলেন,—“সবটা না জেনেও মানুষ এগোয়। অনেক কিছু পথ চলতে চলতেই পরিষ্কার হয়।”
এই কথাটা রিয়ানের মাথায় থেকে যায়।
সেই সপ্তাহেই সে একটি ছোট ইন্টার্নশিপ শুরু করে। শুরুতে কাজগুলো তার কাছে এলোমেলো লাগে, অনেক কিছুই বোঝা কঠিন মনে হয়। কিন্তু ধীরে ধীরে তার মধ্যে একটা উপলব্ধি তৈরি হয়—শুরুর পর্যায়ে কেউই পুরোপুরি প্রস্তুত থাকে না, এই অপ্রস্তুত অবস্থাটাই অনেক সময় বাস্তব।
একদিন কাজ শেষে সে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকে। হালকা বাতাস বইছে। সে খেয়াল করে, ভেতরের চাপটা পুরোপুরি চলে যায়নি, কিন্তু তার ওজন কিছুটা কমে এসেছে। যেন একই বিষয় এখন আর পুরো মনোযোগ দখল করে রাখছে না।
এই অবস্থায় তার মনে হয়, সব প্রশ্নের উত্তর একসাথে পাওয়ার প্রত্যাশাটা হয়তো বাস্তবসম্মত না।
অনিশ্চয়তা তখন তার কাছে এক ধরনের শূন্যতা না হয়ে বরং এমন একটি জায়গার মতো মনে হয়, যেখানে সে নিজের সীমা ও সম্ভাবনা দুটোই পরীক্ষা করছে।
এক সন্ধ্যায় সে বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে।—“মনে হয় আমি এতদিন ঠিক প্রশ্নটাই ধরতে পারিনি।”
বন্ধু কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,—“হতে পারে।”
এর বেশি কিছু বলে না।
রিয়ান জানালার বাইরে তাকায়। আকাশে মেঘ জমেছে, তবে পুরোটা অন্ধকার না। কোথাও কোথাও আলো দেখা যাচ্ছে, অনিয়মিতভাবে। সে তাকিয়ে থাকে—যার মানচিত্র এখনো পুরোপুরি তৈরি হয়নি।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।