বৃদ্ধাশ্রমে জমে থাকা অসমাপ্ত গল্প
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ০২ আগষ্ট, ২০২৬
বৃদ্ধাশ্রমের গেট পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গেই অভিক থমকে দাঁড়াল। ভিতরে কোনো হইচই নেই—মানুষ আছে, কথা আছে, তবু চারপাশে একটা নীরবতা জমে আছে, এমনভাবে যে মনে হয় কেউ শব্দ কণ্ঠে আঁচড় লাগিয়ে দিয়েছে। এখানে সবাই যেন খুব আস্তে বলে; পাছে শব্দে কারো ঘুম ভেঙে যাবে।
দোতলার বারান্দায় কয়েকজন বসে আছেন। একজন রেলিং ধরে বাইরে রাস্তার দিকে চেয়ে আছেন, আরেকজন মাথা নিচু করে নিজের হাতের রেখা দেখছেন। গেটের কাছে এক বৃদ্ধ বারবার বাইরের দিকে তাকাতে পারেন—কাউকে খুঁজছেন, না হয় প্রতিদিন অনুশীলনস্বরূপ তাকিয়ে থাকা। নীরবতার ভেতরেই একটি আলাদা অপেক্ষা মিশে আছে।
নিশি কোমল সুরে বলল, "চলো, ওদিকে যাই।" তারা ফল, ওষুধ, কিছু দরকারি জিনিস নিয়ে এসেছিল; কিন্তু মিনিট দশেকের মধ্যেই অভিক বুঝে গেল, এখানে ওসবের চেয়েও বেশি দরকার একজন মন দিয়ে শোনার মানুষ।
এক বৃদ্ধা হাত তুলে ডেকলেন,
"এই বাবা, একটু বসবি?"
অভিক পাশে গিয়ে বসল। বৃদ্ধার চোখ ভাঁজে ভাঁজে স্মৃতির ঢেউ—হলুদ দাগ, দীর্ঘ সংসারের আঁচ।
তিনি বললেন, "আমার নাতিটাও তোর মতোই বড় হয়েছে। যেতেই বলেছিল, 'দিদা, তাড়াতাড়ি আসব।'" তিনি একটু থেমে নিজের শাড়ির আঁচল মোচড়াতে লাগলেন। "হয়তো ওর কাছে এখনো তাড়াতাড়িই চলছে," বলে নিজেই হেসে উঠলেন—হাসিটা বেশিক্ষণ টেকল না; বাতাসে মিলিয়ে গেল।
পাশের ঘরে একজন বৃদ্ধ এক পুরোনো অ্যালবাম কোলে নিয়ে বসে ছিলেন। অভিক দেখে তিনি অ্যালবামটা এগিয়ে দিলেন। "এটা ছোট ছেলের বিয়ে," তিনি বললেন। "কি দৌড়ঝাঁপ ছিল সেবার! ভেবেছিলাম নাতিদের বড় হতে দেখব, তাদের বিয়েতে এমন করে খাটব।" তিনি ছবির ওপরে হাত বুলিয়ে এলবামটা আস্তে করে বন্ধ করলেন। "সব হিসেব তো আর মেলে না, বাবা,"—এই কথাটা ভাঙা-ভাঙা নীরবতায় শেষ হল। কথার পর আর কিছু থাকে না; অভিকও চুপ করে রইল।
বিকেলে নিশি দেখল, সকালের সেই লোকটা এখনো গেটের কাছে দাঁড়িয়ে আছেন—অপরিবর্তিতভাবে। নিশি গিয়ে জিজ্ঞেস করল, "কারো আসার কথা আছে?"
লোকটা হেসে মাথা নাড়লেন, "থাকুক আর না-ই থাকুক। একটু অপেক্ষা করলে সময়টা তাড়াতাড়ি কাটে।" নিশি চুপ করে গেল; দেখল, অপেক্ষাও এক ধরনের কাজ—এখনো সে আগে কখনো এইভাবে ভাবেনি যে কাউকে শুধুই অপেক্ষা করিয়ে রাখা একটুকু দায়, একটুকু প্রার্থনা।
ফেরার আগে তত্ত্বাবধায়ক বললেন, "এখানে সবাই অপেক্ষা করে। কেউ ফোনের, কেউ দেখা করার, কেউ শুধু চেনা কোনো মুখের।" অভিক গাড়িতে উঠে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল; রাস্তা পেরোতে পেরোতে হঠাৎ বলল, "খেয়াল করেছিস?
এখানে শুধু মানুষকে মিস করা হয় না—কিছু কথা আছে, যেগুলো শেষ হয়নি। 'আসব, নিয়ে যাব', কয়েকটা দিনের ব্যাপার—যারা বলেছে, তারা হয়তো ভুলে গেছে; কিন্তু যারা শুনেছে, তারা ভুলতে পারে না।"
নিশি জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল, "সব মানুষই বাঁচার জন্য একজন শ্রোতা খোঁজে।" গাড়িতে আর কোনো কথা হলো না; শব্দগুলো হৃদয়ে জমতে লাগল।
রাতে বাড়ি ফিরে অভিক বাবাকে ফোন করল। বাবা অবাক কণ্ঠে বললেন,
"কী রে?
এত রাতে?
সব ঠিক আছে তো?"
অভিক হাসল, "হ্যাঁ বাবা, সব ঠিক আছে।
আজকে কিছুদিন মন খারাপ ছিল—লোকে ভালো লাগে কথা না শোনালে।" তারপর দুইজন পুরনো দিনের কথা বলতে লাগল—শূন্যতার ছোট ছোট ফাঁকগুলো পুরনো গল্প আর অগ্রাহ্য হাসিতে ভরে উঠল। ওষুধ খাচ্ছিস?
খেতে কি ভালো লাগছে?—এগুলো বয়স্ক মানুষের কথা নয়, মানুষের কথা ছিল।
ফোন রাখা মনখারাপ ভরা হাতটা একটু থমকে রইল; অভিক রাত্রি তাঁবুর নীরবতায় বহুক্ষণ মোবাইলটা নাড়াচাড়া করলেন। সে কেবল ফল কিংবা ওষুধের ব্যাগ বয়ে নিয়ে যায়নি।
তার সঙ্গে আটকে এসেছে কিছু অসমাপ্ত গল্প—কয়েকটা শুরু করা বাক্য, মাঝের ফাঁক, কিছু নীরব শেষ হওয়া কথা। আর এক ভয়ও লেগে এসেছে: তার নিজের কাছের মানুষের গল্পগুলো কি একদিন একেবারে অর্ধেকেই থেমে যাবে?
সেই রাত থেকেই অভিক দেখল—কতটা ছোট্ট খোঁজ, কতো শত অর্ধেক কথা মিলেই এক মানুষের জীবন চালায়। সকালে উঠে সে ডায়েরি টেনে নিল—ডায়েরির প্রথম পাতায় লিখল, 'আজ আমি শুনব।'
এরপর প্রতিদিন সকালে অল্প সময় রেখে বাড়ির ছোটখাটো কথা ছেঁকে নেবার বদলে কারও কথার জন্য সময় রাখবে। বাড়িতে মা-বাবার সঙ্গে একটু বেশি কথা বলল, অফিসে সহকর্মীর কৌতুকের মাথায় হাত দিল, বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়া বন্ধ করল না—একটু বেশি চোখ, একটু বেশি কান।
বৃদ্ধাশ্রম থেকে ফিরেই বুঝে নিল—অসমাপ্ত গল্পগুলো ভর করে না, শোনার সাহসে ভরে যায়। এবং যদি আমরা মাঝে মাঝে থামি—কেউ কারোর কথা শেষ করে দেই—তবে হয়তো কোনোরকম অর্ধেক জীবনের কষ্টও সম্পূর্ণ হতে পারে। অভিক সে নিশ্ছিদ্র বোধটা সঙ্গে রাখল—প্রতিটি মানুষের মুখটা, প্রতিটি চিরাচরিত চাহনি, প্রতিটি অপেক্ষার সময়ই আমাদের কথা শোনার দাবি রাখে।
রাতের শেষে, মোবাইল স্ক্রীন নিভে গেলেও সেই অসমাপ্ত গল্পগুলো অভিকে ছাড়ল না। তারা ধীরে ধীরে ডায়েরির পাতায় জাগতে লাগল—কোথাও শেষ, কোথাও শুরু। পৃথিবীটা হয়তো পালটে যাবে না; কিন্তু এখানে একটি সত্য নিশ্চিত হলো—কখনো কেউ শুনলে অসমাপ্ত গল্পগুলো আর নিঃস্ব হয়ে যায় না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।