যে ঋতুতে বাবা থাকেন না
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ২৫ জুন, ২০২৬
অভিকের মনে হয়, কিছু প্রশ্নের উত্তর বড় হয়েও মেলে না। বরং বয়সের সাথে সাথে সেগুলো আরও ভারী লাগে। কাউকে করা যায় না। শুধু বুকের ভেতর রেখে দিতে হয়, পুরোনো রসিদের মতো।
বাবা চলে যাওয়ার পর একটা প্রশ্ন ওর মাথায় ঘুরত। ছোট প্রশ্ন। “বাবা, আমার গাছে যখন নতুন পাতা গজায়, তোমার পাতাগুলো তখনই ঝরে গেল কেন?” প্রশ্নটা করার সময় পায়নি। যখন বুঝতে শিখল, তখন বাবা নেই।
ছোটবেলায় বাবা মানে ছিল একটা নিশ্চিন্ত শব্দ। ভোরে ঘুম ভাঙত বাবার কাশির আওয়াজে। বারান্দায় খবরের কাগজের খসখস। সন্ধ্যায় গেটের ক্যাঁচ করে খোলার শব্দ। বাবা ফিরলে মনে হতো, দিনটা এবার ঠিকঠাক শেষ হলো।
বাবার হাতে কখনো থাকত কাঁচাবাজারের থলে, কখনো প্রেসক্রিপশন, কখনো ‘সাপ্তাহিক রোববার’। তবে খালি হাতেও ফিরতেন। তাতেও কিছু কম পড়ত না। সেই হাতটা মাথায় রাখলে মনে হতো, পৃথিবীটা অত জটিল না। সামলানো যায়।
বাবার শেষ দিনটা অভিক মনে করতে চায় না। তবু কিছু ছবি নিজে থেকেই ফিরে আসে। হাসপাতালের করিডোর। নীল প্লাস্টিকের চেয়ার। নিশির হাতে মোচড়ানো খালি পানির বোতল। ডাক্তারের নিচু গলা। কয়েকটা শব্দ।
সেদিন বুঝেছিল, কিছু বাক্য জীবনকে মাঝখান দিয়ে কেটে দেয়। এক পাশে—বাবা ছিলেন। অন্য পাশে—বাবা নেই।
বাড়িটা বদলায়নি। বদলে গিয়েছিল বাড়ির ভেতরের শব্দ। বাবার চেয়ারটা জানালার পাশেই রইল। টেবিলে চশমা, একটা কাচে দাগ। আলমারির মাথায় ফিলিপসের পুরোনো রেডিও। অনেক বছর ধরে অচল। বাবা তবু ফেলেননি। মাঝে মাঝে হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে দেখতেন। বলতেন, “একদিন সারিয়ে ফেলব।” সেই একদিনটা আর এলো না।
রাতে মাঝে মাঝে অভিক বাবার ঘরে গিয়ে বসত। কোনো কাজ না। শুধু বসে থাকা। মনে হতো, বাবা এখনই দরজা খুলে বলবেন, “এত রাতে এখানে কী?” একটু বিরক্ত হবেন, আগের মতো। দরজা খুলত না। শুধু দেয়ালঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটা টিক টিক করত।
একদিন নিশি ঘরটা গোছাচ্ছিল। অভিক দরজায় হেলান দিয়ে দেখছিল। নিশি রেডিওর ধুলো মুছতে মুছতে বলল, “এটা ফেলে দিই?”
অভিক কিছুক্ষণ চুপ। “না।”
“চলেই না তো।”
“জানি।”
নিশি আর কথা বাড়াল না। রেডিওটা আবার আগের জায়গায় রাখল। সেদিন অভিক বুঝল, কিছু জিনিস ব্যবহারের জন্য থাকে না। কিছু জিনিস থাকে, কারণ ওটার সঙ্গে একটা মানুষ লেগে আছে।
বছর গড়াল। অভিক কাজে ডুবে গেল। লোকে বলে, উন্নতি করেছে। তবু কিছু মুহূর্তে বাবার কথা হঠাৎ এসে পড়ে। প্রথম স্যালারির এসএমএস যখন এলো। একটা বড় প্রজেক্টে ‘হ্যাঁ’ বলার আগের রাতে। জ্বর নিয়ে একা শুয়ে থাকার সময়। মনে হতো, বাবা থাকলে বেশি কিছু বলতেন না। শুধু বলতেন, “চিন্তা করিস না। ঠিক হয়ে যাবে।” অদ্ভুত, ওই সাধারণ কথাটাই এখনও সাহস দেয়। হয়তো সবচেয়ে দরকারি কথাগুলো সাধারণই হয়।
এক বিকেলে নদীর পাড়ে বসে ছিল দুজন। অনেকক্ষণ চুপচাপ। নিশি হঠাৎ বলল, “তোমার বাবাকে এখনো মনে পড়ে?”
অভিক হাসল। “প্রতিদিন না।”
“তাহলে?”
অভিক পানির দিকে তাকিয়ে বলল, “যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে গলা শুকিয়ে আসে, তখন ভাবি বাবা কী বলতেন।” একটু থেমে বলল, “আগে ভাবতাম বাবা আমাকে ফেলে গেছেন। এখন মনে হয়, কিছু জিনিস রেখে গেছেন।”
“কী?”
“ভয় লাগলেও পা ফেলার অভ্যাসটা।”
সেদিন রাতে বাবার পুরোনো স্টিলের আলমারিটা খুলল অভিক। ভেতরে বাজারের হিসাবের খাতা, ইলেকট্রিক বিলের ফাইল, আর একটা ছোট ডায়েরি। পাতাগুলো হলুদ। বাবার হাতের লেখা—ফোন নম্বর, ১৫ তারিখের মিটিং, চাল-ডালের দাম।
শেষের দিকে একটা পাতায় লেখা: “অভিকের জুতার মাপ: ৯”। তার নিচে আর কিছু নেই।
অভিক অনেকক্ষণ লাইনটার দিকে তাকিয়ে রইল। কোনো উপদেশ না। বড় কোনো কথা না। শুধু একটা মাপ। কত বছর আগে লিখেছিলেন, কে জানে। যখন ছেলের পা ছোট ছিল।
ডায়েরিটা বন্ধ করল না। খোলাই রইল। মনে হলো, কিছু মানুষ চলে গেলেও পুরোপুরি যায় না। তারা রয়ে যায় ছোট ছোট অভ্যাসের ভেতর। সন্তানের জুতার মাপ মনে রাখার মতো তুচ্ছ, অথচ ভারী একটা অভ্যাসের ভেতর।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।