শেষ সাক্ষী
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
গল্প । ১৪, জুন ২০২৬
লোকটা মারা গেল ভোরের ঠিক আগে।
রাতটা না-শান্ত, না-অস্থির। হাসপাতালের করিডোরে বাতাসটা শুধু শব্দ না করে কিছু টেনে নিচ্ছিল, এমন একটা টানাপোড়েন যা চোখে দেখা যায় না, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকলে শরীরে লাগে।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকালে ধূসর আলো। ভোর আসছে কি না বোঝা যায় না, শুধু বোঝা যায় রাত আর আগের জায়গায় নেই।
ভেতরে বেডে মাহবুব শুয়ে ছিল।
নাকে অক্সিজেন মাস্ক, বুকটা ধীরে ওঠানামা করছে। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল সে আছে, মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল শরীরটা শুধু পড়ে আছে, মানুষটা আগেই কোথাও সরে গেছে।
ডাক্তার পরে শুধু বলল, “হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।”
এই ধরনের বাক্য মৃত্যুকে ব্যাখ্যা করে না। শুধু একটা রিপোর্ট বানায়।
মাহবুব। এই নামটাই ছিল তার।
কিন্তু নাম থাকলেই মানুষকে ধরা যায় না।
লাশটা মসজিদে রাখা হলো দুপুরের আগে।
শহরের এই অংশটা এমন—অফিস, দোকান, ভাড়া ফ্ল্যাট। মানুষ আসে, কাজ করে, চলে যায়। কিছুই থাকে না।
মাহবুবও সেই ভিড়েরই একজন ছিল।
তার নাম জানত কয়েকজন সহকর্মী, দারোয়ান, আর দু-একজন প্রতিবেশী। এর বাইরে না।
মসজিদের ভেতরে দুপুরের আগেই ঠান্ডা বাতাস জমে গেল।
লাশ রাখা জায়গাটার চারপাশে মানুষ দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু কেউ খুব কাছে যাচ্ছে না। একটা অদ্ভুত দূরত্ব। যেন কাছাকাছি গেলে কিছু একটা সত্যি হয়ে যাবে।
কেউ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে।
কেউ বারবার বের হয়ে যাচ্ছে, আবার ঢুকছে।
কেউ শুধু সময় কাটাচ্ছে, অপেক্ষা করছে জানাজা কখন হবে।
পরদিন সকালে জানাজার আগে ভিড় জমতে শুরু করল।
প্রথমে কয়েকজন। তারপর আরও।
ভিড় বাড়ল, কিন্তু পরিচয় বাড়ল না।
“উনি কে ছিলেন?”
“অফিসে কাজ করতেন।”
“ভালো মানুষ ছিল।”
এই বাক্যটাই বারবার ফিরে এল।
যেন কারও মৃত্যু হলে এই বাক্যটাই সবচেয়ে নিরাপদ উত্তর।
এর বাইরে কিছু বললে দায়িত্ব নিতে হয়।
মাহবুবের অফিস থেকে কয়েকজন এসেছিল।
ম্যানেজার ছিল, আর কয়েকজন সহকর্মী।
তাদের মুখে সেই পরিচিত অভিব্যক্তি—না খুব দুঃখী, না খুব স্বাভাবিক। মাঝামাঝি একটা জায়গা, যেখানে অনুভূতি রাখা নিরাপদ।
একজন নিচু গলায় বলল,
“চুপচাপ ছিল।”
আরেকজন,
“নিজের মতো।”
এই “নিজের মতো”—এই শব্দটা আসলে একটা দেয়াল। যার ভেতরে আর কিছু ঢোকা যায় না।
ইমাম জিজ্ঞেস করলেন,
“নাম?”
“মাহবুব হোসেন।”
নামটা পড়া হলো।
কিন্তু নামের সঙ্গে কোনো গল্প উঠল না।
যেন নামটা শুধু ডাকের জন্য, পরিচয়ের জন্য না।
জানাজার সময় মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
কেউ দোয়া করছে।
কেউ ফোন পকেটে ঢোকাচ্ছে, আবার বের করছে, যেন কিছু একটা মিস হয়ে যাচ্ছে।
কেউ শুধু সামনে তাকিয়ে আছে, কিন্তু আসলে কোথাও না।
একজন ফিসফিস করে বলল,
“লোকটা তো খুব বেশি মিশত না।”
আরেকজন বলল,
“হ্যাঁ, নিজের কাজ নিয়ে থাকত।”
এই বাক্যগুলো এমনভাবে বলা হয় যেন এগুলোই একজন মানুষের পুরো ব্যাখ্যা।
জানাজা শেষ হলো।
মাটি পড়ল।
একটা ভারী নীরবতা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল, তারপর সেটাও চলে গেল।
মানুষ সরে যেতে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যে জায়গাটা আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল।
যেন কিছুই ঘটেনি।
অফিসে ফিরে সব আগের মতো হয়ে গেল।
ফাইল খুলল।
ইমেইল গেল।
মিটিং শুরু হলো।
একটা চেয়ার খালি করা হলো খুব স্বাভাবিকভাবে।
ডেস্কটা গুছিয়ে ফেলা হলো।
ক্যালেন্ডার আপডেট হলো।
কেউ কিছু বলল না।
যেন সেই চেয়ারটা কখনো কারও ছিল না।
কিন্তু ছিল।
শুধু এখন আর দরকার রইল না।
বিকেলে একজন জুনিয়র স্টাফ জিজ্ঞেস করল,
“এই নামটা কোথাও যেন শুনেছি…”
এক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর কেউ বলল,
“হ্যাঁ… ভালোই ছিল।”
এই “ভালোই ছিল”—এটা কোনো বর্ণনা না। এটা একটা বন্ধ দরজা।
মাহবুবের ফোন পরে পরিবারের হাতে গেল।
খুব বেশি কিছু ছিল না।
কিছু কল।
কিছু মেসেজ।
“খেয়েছ?”
“দেরি করো না।”
“কেমন আছো?”
এই প্রশ্নগুলো খুব সাধারণ, কিন্তু আসলে এগুলোই সম্পর্কের কাঠামো।
মানুষ বড় কথা কম বলে, ছোট প্রশ্নে জীবন চালায়।
একটা মেসেজ ছিল—“তুমি বদলে গেছ।”
উত্তর—“হতে পারে।”
এরপর আর কিছু নেই।
এই “এরপর আর কিছু নেই”—এটাই অনেক জীবনের শেষ লাইন।
দিন যায়। সপ্তাহ যায়।
নামটা ধীরে ধীরে কথার বাইরে চলে যায়।
মানুষ আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
কেউ মনে রাখে না, কারণ মনে রাখার মতো কিছু নির্দিষ্ট থাকে না।
মাহবুব একা থাকত। একা খেত। একা ঘুমাত।
একা হাঁটত। একা বাজারে যেত।
একা ফিরে আসত।
এই “একা”—শুরুতে অবস্থা ছিল, পরে অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল।
একদিন একজন প্রতিবেশী বলেছিল,
“চাচা, কারও কাছে চলে যান না?”
মাহবুব একটু হেসেছিল।
“কার কাছে যাব?”
এই প্রশ্নের পরে আর প্রশ্ন হয়নি।
কখনো কখনো সন্ধ্যায় সে জানালার পাশে বসে থাকত।
রাস্তায় মানুষ চলাচল করত।
কেউ কাউকে চিনত, কেউ চিনত না।
সবাই ব্যস্ত, কিন্তু কেউ একা না এমন না।
মাহবুব সেটা দেখত। কিন্তু কিছু বলত না।
শুধু বসে থাকত।
কয়েক বছর আগে তার জীবনও অন্যরকম ছিল।
কাজ ছিল, ব্যস্ততা ছিল, কিছু আশা ছিল।
তারপর ধীরে ধীরে সব ছোট হয়ে আসে।
আলো কমে আসে।
ফোন কমে আসে।
মানুষ কমে আসে।
শেষে শুধু সময় থাকে।
কবরটা শহরের এক কোণে।সাধারণ মাটি।
একটা ছোট পাথর।
নাম লেখা।
তার ওপর ধুলো জমে।
বর্ষা আসে। শুকিয়ে যায়।
রোদ আসে। ঢেকে দেয়।
কেউ পরিষ্কার করে না।
কারণ কেউ খোঁজ করে না।
অনেক পরে একদিন একজন লোক এসে দাঁড়াল।
চারপাশে তাকিয়ে বলল, “এটা কার কবর?”
কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারল না।
শেষে একজন বলল,“একজন ছিল।”
এই “একজন”—এই শব্দটার মধ্যে কোনো পরিচয় নেই।
তবু পুরো একটা জীবন এখানে চাপা পড়ে আছে।
যার কোনো নাম নেই এখন, শুধু একটা জায়গা আছে।
রাত নামার আগে কবরস্থান আবার চুপ হয়ে যায়।
বাতাস নড়ে। পাতা কাঁপে। তারপর থেমে যায়।
যেন কিছুই ঘটেনি।
কিন্তু প্রশ্নটা থেকে যায়।
খুব ধীরে। খুব সাধারণভাবে।
আর ঠিক ততটাই অস্বস্তিকরভাবে।
আমরা কি মানুষকে সত্যিই চিনি?
নাকি শুধু তাদের উপস্থিতির শব্দটা মনে রাখি?
আর যখন কেউ চলে যায়, তখন আমরা কি সত্যিই তাকে বিদায় দিই?
নাকি শুধু নিজের ভেতরের অস্বস্তিটা দ্রুত বন্ধ করি?
শেষ প্রশ্নটা আরেকটু কাছে এসে দাঁড়ায়।
আজ যদি আপনার জানাজা হয়—
সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মধ্যে কতজন আপনাকে সত্যিই চিনত?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।