অভিকের ঈদের এক ফালি চাঁদ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ১০ মার্চ, ২০২৬
আমার নিয়মিত পাঠকেরা অভিককে চেনেন। একজন সাধারণ মানুষ। বহুদিন ধরে হার্টের জটিল রোগে ভুগছে, তবু সংসার আর দুই মেয়ের দিকে তাকিয়ে নিরিবিলি চলে যাচ্ছে জীবনটা।
ছোট মেয়ে ভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছে। চোখে অবারিত স্বপ্ন। ছেলেমানুষি ভাবটা এখনো পুরোপুরি যায়নি। অভিকের কঠিন বাস্তবতা যেন তার স্বপ্নের উপর ছায়া ফেলতে পারছে না।
মেয়েটির বায়না শেষ হয় না। ঈদে এটা-ওটা কিনে দিতে হবে—নিজের অন্তরের ইচ্ছেটাও সে জানে। সব কেনাকাটা দেখে সে ভাবে, "হয়তো এবার ঈদে আমি অনেক কিছু পাব।"
অভিক সব সময় বলতেন,
"দিব মা, তোমাকে সব কিনে দিব।"
কিন্তু অভিক অসুস্থ, কর্মহীন। বুকের কষ্টগুলো পুষে রেখে সব সহ্য করে। আজ সেই ব্যথা সীমা ছাড়িয়ে গেছে।
প্রচণ্ড বুকের ব্যথা নিয়ে অভিক বিছানায় শুয়ে পড়ে।
মেয়েরা কাছে আসে। চোখে পানি টলমল করছে।
"আব্বু, ঈদ তো সারা সময় করলাম। সামনের বছর আবার ইদ আসবে, তখনই আমরা ঈদ করবো।"
কথাটা শুনে অভিকের বুক যেন ভেঙে যায়। চোখের পানি ধরে রাখতে পারে না। হাওমাও করে কাঁদতে শুরু করে। মেয়েদের সান্ত্বনা তার বুকের মধ্যে এক প্রবল ঝড় তোলে। সারাটা সময় সে ভাবে—কেন এমন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হলো?
কেন তার জীবন এত কঠিন?
কোনো উত্তর নেই।
দিনগুলো ধীরে ধীরে এগোয়। অভিকের ব্লক যেন ধীরে ধীরে তার জীবনীশক্তি ম্লান করে দিচ্ছে।
ছোট মেয়ে বারবার আসে। এখন আর বায়না করে না। বুঝতে পারছে, তাদের উপর এক অজানা ঝড় এসেছে। কেবল অভিকের চোখের জল তার একমাত্র সম্বল।
ছোট মেয়েকে ডেকে মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,
"মা, তোমার যা লাগে সব এনে দিবো।"
মেয়েটি বাবার অশ্রুসিক্ত চোখের দিকে তাকিয়ে, যেন এক অজানা সান্ত্বনা নিয়ে পাশের ঘরে চলে যায়।
বড় মেয়ে টিউশনি শুরু করে। হয়তো বুঝেছে, এইবার জীবনের পাঠটাই সম্পূর্ণ।
নিশিকে তো চেনেন, অভিকের ভালোবাসা। অসুস্থতার পর সে যেন কেমন স্থির চিত্রের মতো হয়ে গেছে। সময় হয়তো তাদের সংসারকে আর এক সুতায় বাঁধতে দেবে না।
ঈদের বাকি কয়েক দিন ক্রমশ গভীর রাতের মতো নেমে আসে। অভিক একান্ত মনে ভাবে—জীবনের কথা, হঠাৎ আসা ঝড়ের কথা।
কয়েক দিনের মধ্যেই ঈদ। সবাই আনন্দে মাতোয়ারা হবে, নতুন কাপড় পরে চারপাশ ঘুরে বেড়াবে। কেবল সবার আড়ালে অভিক আর তার মেয়েরা পার করবে এক দীর্ঘ্য নীরব দিন।
অভিকের মনে হয়, সে হেরে গেছে—সমাজের নিষ্ঠুরতা আর সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছার কাছে। চারপাশে কেউ নেই, কারো কাছে সাহায্য বা দৃষ্টি নেই।
সব ভাবতে ভাবতে শরীর ঘেমে ওঠে। বুকের চাপ চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। দূরের আলো যেন আরও দূরে সরে যায়। শব্দগুলো অস্পষ্ট হয়ে আসে।
তবু চোখে ভেসে ওঠে ঝলমলে মেয়েদের মুখ। আর আবছা সরু ঈদের ফালি চাঁদ।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।