চাঁদের গন্ধে ভেজা দুই জীবন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
সাহিত্যিক ছোটগল্প। ১৭ মে, ২০২৬
গ্রামের শেষ প্রান্তে যেখানে কাঁচা মাটির পথ হঠাৎ ধানক্ষেতের ভেতর মিলিয়ে যায়, সেখানেই রাতটা একটু বেশি নীরব। চাঁদের আলো এখানে শুধু আলো না—এটা যেন একটা উপস্থিতি, যেটা কিছু না বলে সবকিছু দেখে যায়।
সেই রাতে নিশু নদীর ধারে দাঁড়িয়ে ছিল। নদীটা খুব বড় না, কিন্তু চাঁদের আলো পড়লে মনে হয় এটা পৃথিবীর সবচেয়ে ধীরগতির আয়না। পানির উপর ভাঙা চাঁদ কাঁপছে, আবার জোড়া লাগছে।
নিশু চাঁদকপালি। গ্রামের মানুষ তাকে এই নামেই ডাকে। কারণ সে নিয়মে বাঁধা থাকতে পারে না। ঘড়ির সময় তার কাছে শুধু একটা পরামর্শ, আদেশ না। স্কুলের ঘণ্টা পড়লেও সে অনেক সময় জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে—মনে হয়, পৃথিবীটা একটু দেরিতে শুরু হলেই ভালো হতো।
তার পায়ে নূপুর। কিন্তু সেই নূপুর শব্দ করে না, যেন শব্দটাও তার ভেতরে লুকিয়ে গেছে। নিশু নদীর পানির দিকে তাকিয়ে আছে। তার ভেতরে স্বপ্ন আছে, অনেক স্বপ্ন। শহরে যাওয়া, আঁকা শেখা, নিজের মতো করে কিছু হওয়া—স্বপ্নগুলো সে আলোর মতো করে বুনে রাখে, কিন্তু কোথাও বাঁধে না। কারণ সে বিশ্বাস করে, বাঁধলে স্বপ্ন শ্বাস নিতে পারে না।
ঠিক তখনই পেছনে পায়ের শব্দ। আরিফ।
গ্রামে সবাই তাকে “আলোর মতো ছেলে” বলে ডাকে। কারণ তার রাগ নেই, অভিযোগ নেই, উচ্চ শব্দ নেই। সে খুব কম কথা বলে, কিন্তু তার নীরবতা অন্য মানুষের ভেতরের শব্দ কমিয়ে দেয়।
আরিফ নদীর ধারে এসে বসে। তার হাতে বাঁশি। বাঁশিটা পুরোনো—কোথাও পোড়া দাগ, কোথাও ফেটে যাওয়ার চিহ্ন। তবু সে বাজায়, যেন শব্দটা ভাঙা হলেও অনুভূতিটা ঠিক আছে।
নিশু তাকায় না প্রথমে। সে জানে সে এসেছে।
আরিফ বলে, “আজ নদীটা বেশি চুপ।”
নিশু হালকা হাসে। “নদী কি কখনো কথা বলে?”
আরিফ একটু থামে। “না। কিন্তু আমরা শুনতে চাই।”
বাতাসে শিউলি ফুলের গন্ধ। কোথাও দূরে কুকুর ডাকে। রাত আরও গভীর হয়।
নিশু জিজ্ঞেস করে, “তুমি সবসময় এখানে কেন আসো?”
আরিফ বাঁশির দিকে তাকিয়ে থাকে। “কারণ আমি কোথাও না থাকলে এখানে থাকি।”
এই বাক্যের পরে কিছুক্ষণ কেউ কথা বলে না।
নিশু নদীর দিকে তাকায়। তার চোখে এখনো স্বপ্ন আছে, কিন্তু সেই স্বপ্নের পাশে একটা ছোট্ট প্রশ্ন বসে গেছে—সব স্বপ্ন কি সত্যি জায়গা খুঁজে পায়?
আরিফ হঠাৎ বলে, “তুমি যদি শহরে চলে যাও, তাহলে কি ফিরে আসবে?”
নিশু চুপ থাকে। তারপর বলে, “ফিরে আসা মানে কী? যেখানে মানুষ বদলে যায়, সেখানে কি ফিরে যাওয়া যায়?”
আরিফ উত্তর দেয় না।
কারণ কিছু প্রশ্নের উত্তর থাকে না, শুধু অপেক্ষা থাকে।
বাঁশির শব্দ হঠাৎ থেমে যায়।
নদীর পানি একটু বেশি জোরে কাঁপে, যেন কোনো অদৃশ্য হাত স্পর্শ করেছে।
নিশু উঠে দাঁড়ায়। “আমি যাই।”
আরিফ মাথা নাড়ে। “যেও।”
নিশু হাঁটতে শুরু করে। তার নূপুর এবারও শব্দ করে না, শুধু বাতাস একটু নড়ে যায়।
আরিফ বসে থাকে নদীর ধারে।
চাঁদ এখন ঠিক মাঝ আকাশে। আলোটা পানিতে ভেঙে ভেঙে পড়ছে।
আরিফ খুব আস্তে বলে, “সব গিয়েছে…”
কেউ শোনে না।
নদী শুধু বইতে থাকে। চাঁদ শুধু থাকে। আর কিছু মানুষ থেকে যায়—যাদের গল্প শেষ হয় না, শুধু নীরব হয়ে যায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।