ভালো থেকো বাবা
লেখকঃ মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ধরণঃ ছোটগল্প
তারিখঃ ০৭ অক্টোবর ২০২৫
আমার বাবা বিদেশে ছিলেন টানা বারো বছর। দুই-তিন বছর পরপর দেশে ফিরতেন। তখনই বাবাকে “বাবা” বলে ডাকার সুযোগ পেতাম।
বাবা বাড়ি এলেই মনে হতো, যেন ঈদের দিন এসেছে।
বিদেশ থেকে ফেরার সময় বাবা সবার জন্য দামি সাবান, শ্যাম্পু, কসমেটিকস, মায়ের জন্য অলংকার, আর আমার জন্য চকোলেট, খেলনা পুতুল, গাড়ি, জুতা—সবকিছু নিয়ে আসতেন। অথচ তিনি নিজে আসতেন সেই পুরোনো শার্ট আর ক্ষয়ে যাওয়া জুতা পরে।
সবার জন্য যত কিছুই কিনুন না কেন, নিজের জন্য কিছু কেনার মতো টাকা তার কাছে থাকত না।
বাবা দেশে থাকলে ঘরে প্রতিদিন ভালো ভালো খাবার রান্না হতো, অতিথিরা আসতেন একের পর এক। বাবা লাগেজ খুলে সবাইকে কিছু না কিছু উপহার দিতেন। কেউ সমস্যা বললে, বাবা কাউকে খালি হাতে ফিরিয়ে দিতেন না।
কিন্তু বাবার চলে যাওয়ার দিন ঘরটা নিঃশব্দ হয়ে যেত। সন্ধ্যার পর বাড়ির আশপাশে কুকুরগুলোরও ডাক শোনা যেত না—কারণ তখন আর বাড়িতে মাংসের হাড় পড়ত না। আত্মীয়স্বজনরাও দূরে সরে যেতেন, যেন অপেক্ষা করতেন—কবে আবার বাবা আসবেন ছুটিতে।
আমার জন্মের পর থেকেই বাবা বিদেশে ছিলেন। দু-তিন বছর পরপর ১৫ দিন বা এক মাসের জন্য দেশে আসতেন। ফোনে বাবাকে প্রায়ই বলতাম—
“বাবা, তুমি দেশে চলে আসো না? সবার বাবা তো সকালে অফিসে যায়, সন্ধ্যায় ফিরে আসে। তুমি এমন কোনো চাকরি নিতে পারো না?”
বাবা হাসতেন, বলতেন—
“মামনি, আর ক’টা দিন মা। এখন চলে এলে তোমাদের কষ্ট হবে। টাকা-পয়সা তেমন নেই। একটু ধৈর্য ধরো, আমি একেবারেই চলে আসব। তুমি শুধু ভালো করে পড়ো।”
আমি জানতে চাইতাম,
“বাবা, তুমি বিদেশে কী কাজ করো?”
বাবা হেসে বলতেন,
“আমি বড় অফিসের বড় অফিসার মা।”
দেশে ফিরে বাবার হাত যখন আমার গালে ছুঁয়ে যেত, মনে হতো যেন রুক্ষ পাথরের টুকরো ছুঁয়ে আছি। বলতাম,
“বাবা, তোমার হাত এত শক্ত কেন?”
বাবা বলতেন,
“বিদেশের পানি ভালো না মা, এসি রুমে থাকতে থাকতে চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে।”
আমি তখন ছোট ছিলাম, তাই বাবার মিথ্যাগুলোও বিশ্বাস করতাম। জানতাম না—আমার বাবা কনস্ট্রাকশনের কাজ করতেন, রোদে পুড়ে, ইট-সিমেন্টের ধুলায় ঢেকে রোজ রক্ত বিক্রি করে উপার্জন করতেন।
আমাদের বাড়ি, দামি সোফা, এলইডি টিভি, আমার স্কুলের ফি—সবই এসেছে সেই পরিশ্রমের টাকায়। অথচ বাবা কখনো কাউকে কিছু বলেননি। ফোনে সবসময় বলতেন—
“ভালো আছি মা।”
কিন্তু আমি জানতাম, বাবা কখনোই ভালো ছিলেন না।
এবার ঈদে বাবা দেশে আসবেন। বলেছিলেন, টিকিট কাটা হয়ে গেছে, লাগেজ গুছানো। মা আর আমি কতখানি খুশি ছিলাম! আমি বাবাকে বলেছিলাম,
“বাবা, এবার কিছু আনবে না, শুধু তুমি এসো।”
বাবা বলেছিলেন,
“তুমি কিছু না বললেও তোমার কী লাগবে আমি জানি মা, সব কিনে রেখেছি।”
ঈদের মাত্র তিন দিন আগে খবর এল—
বাবা আর আসবেন না।
বাবার এক বন্ধু ফোন করে বলল,
“ভাবী... ভাই তো আর নাই।”
মা তখন মূর্তির মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেলেন। আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। পরে শুনলাম—বাবা কনস্ট্রাকশনের ছাদে কাজ করার সময় নিচে পড়ে গেছেন।
বাবার লাগেজ এল, কিন্তু বাবা এলেন না।
আমার জন্য যা যা কিনেছিলেন, সব পেলাম—শুধু বাবাকে ছাড়া।
এখন আমি বুঝি, সুখ মানে সবকিছু থাকা নয়; সুখ মানে বাবার মতো একজন মানুষ থাকা। বাবা সারাজীবন সুখে না থেকেও আমাদের সুখী দেখাতে অভিনয় করে গেছেন।
বাবা, তুমি ভালো থেকো।
তুমি যে ভালোবাসার উত্তরাধিকার রেখে গেলে, তাতে কোনোদিন আমার অভাব হবে না—কিন্তু তোমার অভাব পূরণ করবে কে?
বাবা, তুমি যদি বিদেশে না যেতে, হয়তো টাকাপয়সা কম থাকত, কিন্তু তুমি থাকতে বাবা—তুমি বেঁচে থাকতে।
সব পেয়েও আমি হারালাম আমার পৃথিবীকে।
ভালো থেকো বাবা, অনেক ভালো থেকো।
লাভ ইউ, বাবা।
#ভালোথেকোবাবা #ছোটগল্প #বাংলাসাহিত্য #বিদেশেফেরেনবাবা #বাবারভালোবাসা #বাবাএবংসন্তান #অপেক্ষা #আবেগঘনগল্প #মোহাম্মদজাহিদহোসেন #বাংলাগল্প #প্রবাসীরজীবন
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।