মায়ের নম্বরে রিচার্জ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
আবেগঘন ছোটগল্প। ১৯ অক্টোবর ২০২৬
মায়ের মৃত্যুর সাত মাস পরও রায়হান তাঁর মোবাইল নম্বরে প্রতি মাসে একশ টাকা রিচার্জ করে।
নম্বরটা বন্ধ। সিমটা হয়তো অনেক আগেই বাতিল হয়ে গেছে। তবু মাসের প্রথম সপ্তাহে বেতনের টাকা হাতে এলেই কাজটা তার মনে পড়ে।
এ মাসেও রিচার্জ করার পর মোবাইলের পর্দায় লেখা উঠল, “লেনদেন সফল।”
রায়হান ফোনটা পকেটে রেখে অফিস থেকে বেরিয়ে এল।
মায়ের ঘরের জানালার পর্দাটা এখনো বদলানো হয়নি।
ঢাকায় নতুন ফ্ল্যাট নেওয়ার পর মা একবার বেড়াতে এসেছিলেন। ছেলের ঘরদোর দেখে খুশিই হয়েছিলেন। শুধু শোবার ঘরের জানালার পর্দাটা দেখে বলেছিলেন, “এই পর্দাটা এত পাতলা কেন রে? রাতে বাইরে থেকে ঘরের আলো দেখা যায়।”
রায়হান তখন কম্পিউটারে কাজ করছিল।
“মা, এখনকার পর্দা এমনই হয়। তুমি এসব বুঝবে না।”
মা আর কথা বাড়াননি। পরদিন সকালে নাশতা খেতে বসে আবার বলেছিলেন, “ঘুমানোর আগে জানালাটা ভালো করে বন্ধ করিস।”
রায়হান বিরক্ত হয়ে বলেছিল, “তুমি কি আমার মা, নাকি বাড়ির দারোয়ান?”
মা চায়ের কাপে চুমুক দিয়েছিলেন। তারপর বলেছিলেন, “তা-ও বলতে পারিস।”
সেদিন দুপুরেই মা গ্রামের বাড়িতে ফিরে গিয়েছিলেন।
এরপর ফোনে কথা হতো। মা নিজের কথা খুব একটা বলতেন না। কখনো পাশের বাড়ির আমগাছে মুকুল আসার খবর দিতেন, কখনো বলতেন, বৃষ্টি হলে উঠানের এক পাশে পানি জমে। আর মাঝেমধ্যে জিজ্ঞেস করতেন, “তোর ঘরের পর্দাটা ঠিক করেছিস?”
রায়হান প্রতিবারই বলত, “করব মা, সময় হলে।”
একদিন মা ফোন করে বলেছিলেন, “তুই যদি ব্যস্ত থাকিস, পরে কথা বলিস। একটা কথা জিজ্ঞেস করব।”
রায়হান তখন রাস্তায়। পেছনে গাড়ির হর্ন বাজছিল।
“মা, পরে ফোন দিচ্ছি।”
সেদিন আর ফোন করা হয়নি।
পরদিন দুপুরে ছোট বোনের ফোন এল।
ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে বোন বলল, “ভাইয়া, মা আর নাই।”
রায়হান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর জিজ্ঞেস করল, “কখন?”
“ভোরে। রাতে শরীর বেশি খারাপ হইছিল। হাসপাতালে নেওয়ার আগেই...”
বোনের কথা শেষ হলো না।
রায়হান শুধু বলল, “আমারে ফোন দিছিল?”
ওপাশ থেকে উত্তর এল, “হ্যাঁ ভাইয়া। অনেকবার।”
ফোনটা কানে ধরে সে বসে রইল। বোন আরও কিছু বলছিল, কিন্তু তার আর শোনা হলো না।
মায়ের জানাজা শেষে বাড়িতে লোকজনের ভিড় কমে এলে রায়হান তাঁর ঘরে ঢুকল। ঘরের এক পাশে সেলাই মেশিন, অন্য পাশে পুরোনো কাঠের আলমারি। জানালায় সেই পর্দা। নিচের দিকে সেলাই ছুটে গেছে, এক কোণে ছোট একটা ছিদ্র।
বিছানার পাশে মায়ের ফোনটা পড়ে ছিল।
চার্জার লাগিয়ে ফোনটা চালু করতেই কলের তালিকায় নিজের নাম দেখতে পেল রায়হান। শেষ রাতে মায়ের তিনটি কল।
প্রথমটি রাত দশটা বারো মিনিটে।
দ্বিতীয়টি দশটা ঊনত্রিশে।
তৃতীয়টি এগারোটা তিনে।
কোনো বার্তা ছিল না।
মা কী বলতে চেয়েছিলেন, রায়হান কোনো দিন জানবে না।
জিনিসপত্র গোছানোর সময় আলমারির নিচের তাকে একটি কাপড়ের ব্যাগ পাওয়া গেল। ভেতরে কয়েকটা পুরোনো শাড়ি, সুই-সুতা আর ছোট একটা খাতা। খাতাটায় সংসারের খরচ লেখা ছিল।
চালের দাম আশি টাকা। ডাল ষাট। ওষুধের খরচের পাশে দুবার কাটাকাটি। কয়েকটা হিসাবের নিচে ছোট ছোট অঙ্ক।
শেষ পাতায় এসে রায়হান থামল।
সেখানে লেখা—
“রায়হানের ঘরের পর্দা কিনতে হবে।”
নিচে কয়েকটি হিসাব। একটা অঙ্ক কেটে আবার নতুন করে হিসাব করা হয়েছে।
রায়হান পাতাটা উল্টেপাল্টে দেখল। খাতার অন্য কোথাও নিজের নাম নেই। শুধু এই এক জায়গায়।
সে খাতাটা বন্ধ করে দিল।
মায়ের ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকাল। পাশের বাড়ির উঠানে কয়েকটা বাচ্চা খেলছিল। তাদের মধ্যে একজন পড়ে গিয়ে কেঁদে উঠল। ঘর থেকে এক মহিলা ছুটে এসে ছেলেটাকে কোলে তুলে নিলেন।
রায়হান জানালাটা বন্ধ করে দিল।
ঢাকায় ফিরে সে দোকান থেকে একটা পর্দা কিনল। মায়ের ঘরের পুরোনো পর্দাটার মতোই রং, শুধু কাপড়টা একটু মোটা। পরের শুক্রবার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে নিজেই লাগিয়ে দিল।
পর্দা লাগানো শেষ হলে মায়ের ফোনটা টেবিলের ওপর দেখতে পেল। বাড়ি থেকে ফেরার সময় সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল। চার্জ দেওয়া ছিল।
রায়হান মায়ের নম্বরে কল করল।
একবার।
তারপর আবার।
প্রতিবার একই উত্তর—নম্বরটি বর্তমানে বন্ধ আছে।
সে ফোনটা রেখে দিল।
মাসের প্রথম সপ্তাহে আবার বেতন পেল রায়হান। রাতের খাবার শেষে মোবাইল ব্যাংকিং খুলল। মায়ের নম্বরটা এখনো ‘মা’ নামেই সেভ করা।
একশ টাকা রিচার্জ করল।
পর্দায় লেখা উঠল, “লেনদেন সফল।”
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।