বাবার শেষ সম্বল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
লেখার ধরন : ছোট গল্প
(লেখাটি সম্পূর্ণ বাস্তব কাহিনির ওপর ভিত্তি করে লেখা)
১০ জুলাই, ২০২৬
আজ অনেক দিন হলো অভিকের সাথে আমার দেখা হয় না। নানা কাজের ঝামেলায় অভিকের সাথে দেখা করার সময়ই হয়ে ওঠে না।
আজ শনিবার। তাই ভাবলাম, অভিকের সাথে দেখা করে আসি।
বিকেলের দিকে অভিককে ডাকলাম একটা মার্কেটের সামনে। সামান্য সময় অপেক্ষা করার পরেই অভিক তার সেই চেনা হাসিমুখটা নিয়ে আমার সামনে হাজির হলো। তারপর এ আলাপ সে আলাপ শেষে দুজনে চা খাওয়ার জন্য পাশের একটা হোটেলে গেলাম।
আমাদের সামনে গরম দুই কাপ চা। অভিক হাত বাড়িয়ে ওর কাপটা নিতে গিয়েই খেয়াল করলাম, ওর হাতগুলো কেমন যেন ফোলা ফোলা। সাথে সাথে ওর মুখের দিকে তাকালাম। মুখটাও ফোলা। মনে হচ্ছে পুরো শরীরে পানি জমে আছে।
আমি ওর চায়ের কাপটা ধরার আগেই ওর হাতটা ধরে ফেললাম। দেখলাম, ওর চোখ দুটোও লাল। অভিকের এ অবস্থা দেখে জানতে চাইলাম কী হয়েছে। অভিক তখন আমাকে গতকালের ঘটনাটা বলতে শুরু করল।
ক’দিন ধরেই অভিকের শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। সারাটা সময় মাথায় ছিল অসহ্য যন্ত্রণা। তাই বিকেলের দিকে চোখটা বন্ধ করে কোনোরকমে শুয়ে ছিল। হঠাৎ মাগরিবের সময় উঠে মসজিদে যায়। নামাজ শেষ করে বাসায় ফেরার পর ওর আরও খারাপ লাগতে শুরু করে।
ঠিক তখনই অভিকের এক বন্ধু ফোন করে একটা কফি শপে যেতে বলে।
প্রথমে অভিক যেতে চাচ্ছিল না। কিন্তু বন্ধুটা বারবার ফোন করছিল। না করতে পারছিল না। শেষে অভিক গেল সেই কফি শপে। গিয়ে দেখে, ওর আরেক বন্ধুও সেখানে আগে থেকেই বসে আছে।
অভিককে দেখে বন্ধুটা কিছু খাবারের অর্ডার দিল।
অভিকের সামনের টেবিলেই বসে ছিল একটা পরিবার। বাবা-মা আর তাদের ছোট মেয়েটা। মেয়েটার হাতে রঙিন কাগজে মোড়া একটা পুতুল। গোলাপি জামা, কোঁকড়া চুল। মেয়েটা পুতুলটাকে বুকে জড়িয়ে ধরে খিলখিল করে হাসছে। বাবা মেয়ের ছবি তুলছে।
পুতুলটা দেখে অভিকের বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। নিজের অজান্তেই অভিক সেই পুতুলটার মাঝে দেখতে পেল তার ছোট মেয়ে পরীর মুখখানি।
পরী অভিকের ছোট মেয়ে। পুতুল ভীষণ পছন্দ করে। প্রায়ই বলে, “বাবা, একটা পুতুল কিনে দেবে?” কিন্তু মাসের পর মাস চলে যায়, অভিকের আর হয়ে ওঠে না। শেষ কবে যে সে পরীকে একটা খেলনা কিনে দিয়েছিল, মনেই নেই। অভিকের মনটা আরও ভারী হয়ে গেল। অভিক না পারছে কিছু বলতে, না পারছে সইতে।
তবুও সমাজের একটা নিয়ম আছে। ইচ্ছে করলেই তো সব হয় না। অভিকের আর ওখানে বসে থাকতে ইচ্ছে করছিল না।
অভিক প্রাণপণে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করল। কিন্তু কখন যে নিজের অজান্তে ওর চোখ থেকে এক ফোঁটা পানি হাতের ওপর পড়ল, সে টের পেলেও কাউকে বুঝতে দিল না।
এরপর একে একে আরও বন্ধুরা এলো। সবাই মিলে গল্পে মেতে উঠল। তারপর পাশের পার্কে কিছুক্ষণ আড্ডা চলল। কিন্তু অভিকের মন পড়ে আছে পরীর সেই আবদারের দিকে।
ততক্ষণে রাত প্রায় সাড়ে দশটা। অভিকের সেই আড্ডায় কোনো মন নেই। কারণ বারবার মনে পড়ছিল—আজ পরীর জন্মদিন। অথচ খালি হাতে বাসায় ফিরবে কী করে? অভিক আর স্থির থাকতে পারছিল না।
সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সোজা চলে গেল ফুটপাতের একটা খেলনার দোকানের সামনে।
অভিকের পকেটে তখন ওষুধ কেনার টাকাটা ছিল। ডাক্তার বারবার বলে দিয়েছে, শরীরের যে অবস্থা তাতে ওষুধ এক বেলাও বাদ দেওয়া যাবে না।
কারণ ওষুধ বন্ধ হলে ফুসফুসে পানি জমে যেতে পারে। কিন্তু অভিকের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল না। তাই নিজের ওষুধ না কিনে সেই টাকা দিয়ে পরীর জন্য একটা পুতুল কিনে নিল। লাল জামা পরা, কোঁকড়া চুলের একটা পুতুল।
পুতুলটা কেনার সময় অভিকের শরীর থেকে ঘাম টপটপ করে পড়ছিল দোকানের ঝকঝকে মেঝেতে।
পরী তখনও জেগে ছিল। জন্মদিনে বাবার অপেক্ষায় বসে ছিল। অভিক পরীর হাতে পুতুলটা তুলে দিতেই পরীর চোখে-মুখে খুশি যেন ধরে না। পুতুলটা বুকে চেপে ধরে পরী অভিকের গালে একটা চুমু দিল।
পরী জিজ্ঞেস করল,
"বাবা, এটা সত্যি আমার?"
অভিকের লাল চোখে তখন বন্যার জল।
কোনোমতে নিজেকে সামলে নিল সে।
তারপর পরী আনন্দে পুতুল নিয়ে খেলতে লাগল।
অভিক গোসল সেরে যখন বের হলো, শরীরটা আর চলছিল না। সারাদিনের অসুস্থতা ওকে একদম নিস্তেজ করে দিয়েছে।
আস্তে আস্তে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল অভিক। চোখ দুটো ভারী হয়ে আসছে। কানে বাজছে চারপাশের সব শব্দের প্রতিধ্বনি। তার সাথে শুরু হলো ভয়ানক শ্বাসকষ্ট। কোনোভাবেই নিশ্বাস নিতে পারছিল না। অক্সিমিটারে অক্সিজেনের মাত্রা দেখাচ্ছে ৭০ থেকে ৭৮। অবস্থা স্বাভাবিক না হওয়ায় দ্রুত ছুটল হাসপাতালের দিকে। কিন্তু রাত গভীর হওয়ায় প্রথম হাসপাতাল থেকে তাকে হার্ট হাসপাতালে যেতে বলল।
কিন্তু হার্ট হাসপাতালের খরচ অনেক। সে রাতে আর যাওয়া হলো না। সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা করে ভোরের দিকে বাসায় ফিরে এলো অভিক।
বাসায় এসে অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। টাকা জোগাড় করতে হবে, তারপর হাসপাতাল। কিন্তু শরীরটা আর সইতে পারছিল না।
আজ প্রথমবার অভিক নিজের শরীরের কাছে হেরে গেল। দূরে কানে ভেসে আসছে পরীর হাসি। হাতে নতুন পুতুল।
অভিকের কথাগুলো শুনে আমি একদম চুপ হয়ে গেলাম। কখন যে আমার চোখ থেকে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল অভিকের সেই ফোলা হাতের তালুতে, আমি নিজেও টের পেলাম না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।