এক জীবনের প্রশ্ন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ৫ জুন, ২০২৬
সন্ধ্যার পর থেকেই আকাশটা ভারী হয়ে ছিল।
বারান্দার রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। কয়েকদিন ধরেই শরীরটা ভালো যাচ্ছে না। ঘুম হয়, কিন্তু ঘুম ভাঙার পরও মনে হয় ক্লান্তিটা কোথাও যায়নি।
মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে, যদি একটা পাখি হতাম। কোথাও উড়ে চলে যেতাম। এমন কোনো জায়গায়, যেখানে কারও কোনো প্রশ্ন নেই। কোনো জবাবও নেই।
কিন্তু মানুষ তো আর পাখি হয় না। তাই আমি পাখিদের দেখি।
আমার বারান্দার এক কোণে এক জোড়া চড়ুই অনেকদিন ধরে বাসা বেঁধেছিল। ছোট্ট দুটো প্রাণ। সারাদিন কিচিরমিচির, ওড়াউড়ি, খড়কুটো টেনে আনা আর খুনসুটি। সকালে তাদের শব্দেই ঘুম ভাঙত।
কবে থেকে জানি না, ওদের সঙ্গে কথা বলা শুরু করেছিলাম।
একদিন রাতে ওদের দেখে বললাম,— তোমরা কি কখনও ঝগড়া করো না?
ওরা নিজেদের মতো বসে রইল। আমি হেসে ফেললাম।
তারপর একদিন দেখলাম, পুরুষ চড়ুইটা একা ফিরেছে। ভাবলাম, অন্যটা পরে আসবে।
আসেনি। পরদিনও না। তারও পরদিন না।
এক রাতে ওকে দেখে মনে মনে বললাম,— তোমার সাথী কোথায়?
মনে হলো, ও যেন বলল,— অন্য আকাশে গেছে।
আমি চুপ করে রইলাম। কথাটা শুনে কয়েকটা মুখ মনে পড়ে গেল।
সব চলে যাওয়া কি মৃত্যুর জন্য হয়?
হয় না।
কিছু মানুষ দরজা বন্ধ করে যায় না। তবু আর ফিরে আসে না।
চড়ুইটা এরপরও আসত। বাসার ধারে বসে থাকত। কখনও অনেকক্ষণ, কখনও অল্প।
মাঝের রাতগুলো আরও ভারী হয়ে গেল। বারান্দার কোণে খড়কুটো জমত। আমি সরাতাম না। কেন সরাতাম না, জানি না। হয়তো মনে হতো, কেউ ফিরে এলে বাসাটা চিনতে পারবে।
এভাবেই কয়েক মাস কেটে গেল।
তারপর এক সকালে দেখি, পুরুষ চড়ুইটা একা নয়। পাশে নতুন একটা চড়ুই। ছোট্ট, চঞ্চল, অস্থির।
অনেকদিন পর ওকে অন্যরকম লাগল। দুজনে বাসার চারপাশে ঘুরছে। কখনও পাশাপাশি বসছে। দেখে আমারও ভালো লাগল।
মনে হলো, বাসাটা আবার বাসা হয়ে উঠছে।
সেদিন রাতে অনেকদিন পর মনটা একটু হালকা ছিল।
আর ঠিক সেই রাতেই বৃষ্টি নামল।
প্রচণ্ড বৃষ্টি।
জানালার কাঁচ কাঁপছিল। দূরে দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। আমি শুয়ে শুয়ে বৃষ্টি শুনছিলাম।
হঠাৎ একটা শব্দ পেলাম।
কী ধরনের শব্দ, তা বোঝাতে পারব না। কিন্তু শুনেই বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
আমি উঠে বারান্দায় গেলাম।
পুরুষ চড়ুইটা একা বসে আছে। পুরো ভিজে গেছে। বারবার চারদিকে তাকাচ্ছে। নতুন সাথীটাকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না।
তারপর মনে হলো, ও যেন আমার সঙ্গে কথা বলছে।
খুব আস্তে।
খুব ভাঙা গলায়।
— দুপুরে ও পড়েছিল।
— কোথায়?
— আকাশ থেকে।
আমি কিছু বললাম না।
ও আবার বলল,— ডানা ছিল। তবু উড়তে পারিনি।
বৃষ্টির শব্দ আরও ঘন হয়ে উঠল।
চড়ুইটা চুপ করে ছিল।
আমিও।
তারপর মনে হলো, সে আমাকে একটা প্রশ্ন করল।
— জীবন তো একটা। তবু এক জীবনে এত কষ্ট কেন?
আমি উত্তর দিতে পারিনি।
আজও পারি না। অনেক বছর কেটে গেছে।
আজও মাঝে মাঝে রাতে বারান্দায় দাঁড়াই। আকাশ দেখি। কখনও মেঘ, কখনও তারা। কখনও কোনো চড়ুই এসে রেলিংয়ে বসে।
আমি এখনও বারান্দার কোণে দু-একটা খড়কুটো রেখে দিই।
কেউ যদি ফিরে আসে।
অথবা কেউ যদি নতুন করে বাসা বাঁধতে চায়।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।