যে জন্মদিনে মা কেঁদেছিল
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ২৬ অক্টোবর ২০২৬
আজ আমার ছেলের জন্মদিন, কিন্তু আমি চাইছি ও যেন না হতো।
রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে কথাটা মনে আসতেই কলটা বন্ধ করে দিলাম। পাশের ঘরে আট বছরের ছেলেটা বেলুন ফুলাচ্ছে। একটু পরপর ডাকছে, “মা, দেখো তো, এটা ফাটবে না তো?”
আমি উঁকি দিয়ে বললাম, “আস্তে ফোলাস।”
টেবিলের ওপর কেকের বাক্স রাখা। বিকেলে ওর কয়েকজন বন্ধু আসবে। সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে গলা জড়িয়ে ধরে বলেছে, “মা, আজ কিন্তু কেকটা তুমি কাটবে।”
আমি হেসে মাথা নেড়েছিলাম।
জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকালাম। রাস্তা দিয়ে মেয়েরা অফিসে যাচ্ছে, কারও কাঁধে ব্যাগ, কারও হাতে ফোন। তাদের মধ্যে আমার বয়সী কেউ থাকলে হয়তো এখন নিজের কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকত। হয়তো কলেজের বান্ধবীদের সঙ্গে দেখা করার পরিকল্পনা করত, কিংবা মাসের বেতন থেকে নিজের জন্য কিছু কিনত।
আঠারো বছর বয়সে আমারও এমন একটা জীবন কল্পনা ছিল।
সেদিনের কথা মনে পড়লে এখনো মায়ের মুখটা মনে পড়ে। খবরটা শোনার পর তিনি অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন, তারপর ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। বাবা কয়েক দিন আমার সঙ্গে কথা বলেননি। যে মানুষটাকে বিশ্বাস করে জীবনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, সে-ও শেষ পর্যন্ত পাশে থাকেনি।
এরপর আমার জীবনে একটা ছোট্ট মানুষ এল। তার কান্না থামাতে গিয়ে কত রাত যে নিজের কান্না লুকিয়েছি, তার হিসাব নেই।
একদিন রাতে ছেলে খুব কাঁদছিল। আমি ক্লান্ত হয়ে বিছানায় বসে ছিলাম। পাশের বাড়ি থেকে বান্ধবীদের হাসির শব্দ আসছিল। তারা তখনো কলেজে পড়ত। আমার বইগুলো আলমারির ওপর ধুলো জমিয়ে পড়ে ছিল।
ছেলেটাকে কোলে তুলে নিতেই সে কান্না থামিয়ে আমার জামা আঁকড়ে ধরেছিল।
আমি ওকে বুকে চেপে ধরেছিলাম। তবু মনে মনে ভেবেছিলাম, আমার জীবনটা যদি অন্য রকম হতো!
সেই ভাবনাটা আজও পুরোপুরি যায়নি। ছেলের প্রতি ভালোবাসার কথা ভাবলে যেমন বুক ভরে ওঠে, তেমনি নিজের হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কথা মনে পড়লে কোথাও একটা শূন্যতা তৈরি হয়। কথাটা কাউকে বলিনি। বললে হয়তো সবাই ভাবত, আমি খারাপ মা।
“মা!”
ছেলের ডাকে ফিরে তাকালাম। ওর হাতে একটা কাগজের মুকুট।
“এটা তোমার জন্য বানিয়েছি।”
আমি মুকুটটা হাতে নিয়ে দেখলাম। কাগজের ওপর রঙিন পেনসিল দিয়ে আঁকিবুঁকি, এক পাশে একটু ছিঁড়ে গেছে।
“আমার জন্য কেন?”
ছেলে অবাক হয়ে বলল, “তুমি আমার মা। আমার জন্মদিনে তোমাকেও তো সাজতে হবে!”
আমি হাসলাম। ও নিজেই মুকুটটা আমার মাথায় পরিয়ে দিল। তারপর দুই হাত কোমরে রেখে আমাকে দেখতে লাগল।
“তোমাকে সুন্দর লাগছে, মা।”
আমি ওর কপালে চুমু খেলাম। ও আবার বেলুন নিয়ে ব্যস্ত হয়ে গেল।
বিকেলে ঘর ভরে গেল বাচ্চাদের চিৎকারে। কেকের ওপর মোমবাতি জ্বালানো হলো। ছেলে চোখ বন্ধ করে ইচ্ছা করল, তারপর ফুঁ দিয়ে মোমবাতি নিভিয়ে দিল। সবাই হাততালি দিল।
কেক কাটার পর ও নিজের টুকরো থেকে একটু তুলে আমার মুখের সামনে ধরল।
“মা, তোমার জন্য।”
আমি কেকটা খেয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম।
কিছুক্ষণ পর ছেলেটা বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে চলে গেল। টেবিলে পড়ে রইল কেকের বাক্স, কাগজের প্লেট আর কয়েকটা ফেটে যাওয়া বেলুন।
আমি মুকুটটা খুলে হাতে নিলাম। কাগজের এক কোণে ছেলের হাতের লেখায় আমার নাম।
জানালার বাইরে তখন সন্ধ্যা নামছে।
আমি মুকুটটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলাম।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।