প্রতিদিন তিনজনের খাবার রান্না করেন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
একাকিত্ব ও স্মৃতির ছোটগল্প
১৯ অক্টোবর ২০২৬
অভিক মারা যাওয়ার পরও নিশি প্রতিদিন দুজনের খাবার রান্না করত।
সকালে চাল ধোয়ার সময় এক মুঠো বেশি নিত। ডাল চড়ালে দুটো বাটি নামাত। ভাত নামানোর পর একটা থালায় খাবার বেড়ে জানালার পাশের ছোট টেবিলে রাখত। তারপর নিজের থালা নিয়ে বসত।
মিশি আর নীলা প্রথম দিকে কিছু বলত না। মায়ের পাশে বসে খেত, খাওয়া শেষে নিজেদের থালা ধুয়ে রাখত। কিন্তু একদিন মিশি দেখল, মা মাছের ঝোলের বাটিটা দ্বিতীয় থালার কাছে টেনে রাখছে।
“মা, তুমি আবার বাবার জন্য খাবার রেখেছ?”
নিশি মাছের কাঁটা বেছে নিতে নিতে বলল, “তোর বাবা ঝোল দিয়ে ভাত খেতে পছন্দ করত।”
মিশি আর কিছু বলল না।
অভিক মারা গেছে এগারো মাস আগে। শেষ কয়েকটা মাস বিছানায় শুয়ে কাটাতে হয়েছিল তাকে। নিশি নিজের হাতে খাওয়াত। ভাতের সঙ্গে মাছ মেখে ছোট ছোট লোকমা করে দিত। অভিক মাঝে মাঝে বিরক্ত হয়ে বলত, “আমি কি বাচ্চা নাকি?”
নিশি বলত, “বাচ্চাদের মতোই তো খেতে চাও।”
তখন দুজনেই হাসত।
এখন ঘরে হাসির শব্দ নেই। শুধু দুপুরে ভাতের হাঁড়ির ঢাকনা খোলার শব্দ হয়, সন্ধ্যায় ওষুধের খালি শিশিটা সরাতে গিয়ে টুং করে ওঠে, আর রাতে ঘুমানোর আগে নিশি বিছানার ডান পাশের বালিশটা একটু চাপড়ে সমান করে দেয়।
ওই পাশটা খালি থাকে।
একদিন স্কুল থেকে ফিরে নীলা দেখল, মা রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে মাছের কাঁটা বেছে রাখছে। ছোট্ট বাটিতে কাঁটাগুলো জমা হচ্ছে, আর পাশে রাখা থালায় মাছের নরম অংশ।
“মা, কাঁটা আলাদা করছ কেন?”
“তোর বাবা কাঁটা বেছে খেতে পারত না।”
নীলা চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। সে বাবাকে খুব স্পষ্ট মনে করতে পারে না। বাবার গলার স্বরও এখন মনে করতে গেলে ঝাপসা লাগে। শুধু মনে পড়ে, বাবা তাকে কাঁধে তুলে ঘরের দরজার ওপর হাত ছোঁয়াতে দিতেন। আর মিশি বলত, “আরও ওপরে, বাবা!”
নিশি মাছের টুকরোটা দ্বিতীয় থালায় রাখল।
সেদিন রাতে মিশি মায়ের ঘরে এসে বসেছিল। হাতে স্কুলের খাতা, কিন্তু পড়ছিল না। নিশি বিছানায় কাপড় ভাঁজ করছিল।
“মা, তুমি কি এখনো বাবার সঙ্গে কথা বলো?”
নিশির হাত থেমে গেল।
“কেন?”
“তুমি যখন রান্না করো, তখন মনে হয় বাবাকে বলছ—আজ কী রান্না করেছ, কী হয়নি।”
নিশি কাপড়টা ভাঁজ করে পাশে রাখল। জানালার বাইরে অন্ধকার নামছিল। সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, “তোর বাবা বাড়ি ফিরলে আমি সারাদিনের সব কথা বলতাম। এখন বলার মতো কথা জমে থাকে।”
মিশি মায়ের পাশে এসে বসল।
“আমাদের বলতে পারো।”
নিশি মেয়ের মাথায় হাত রাখল। তারপর আবার কাপড় ভাঁজ করতে শুরু করল।
পরদিন দুপুরে নীলা স্কুল থেকে ফিরে দেখল, মায়ের শরীর ভালো নেই। তবু রান্নাঘরে দাঁড়িয়ে ভাত নামাচ্ছে। নীলা এগিয়ে গিয়ে হাঁড়ির হাতল ধরল।
“তুমি বসো, মা। আমি নামাচ্ছি।”
নিশি প্রথমে দিতে চাইল না। পরে চুপ করে সরে দাঁড়াল।
নীলা দুটো থালা নামিয়ে খাবার বেড়ে দিল। একটায় ভাত, ডাল আর আলুভর্তা। অন্যটায় ভাতের পাশে মাছের ঝোল। সে দ্বিতীয় থালাটা জানালার পাশের টেবিলে রেখে মায়ের দিকে তাকাল।
“বাবা কি এই জায়গায় বসত?”
নিশি মাথা নাড়ল।
“প্রতিদিন?”
“প্রায় প্রতিদিন। ছুটির দিনে এখানে বসে পত্রিকা পড়ত। খাওয়ার সময়ও খবরের কাগজটা পাশে রাখত।”
নীলা চেয়ারটা একটু সরিয়ে দিল। তারপর দ্বিতীয় থালার পাশে একটা গ্লাস পানি রাখল।
“বাবা পানি খেতে ভুলে যেত, তাই না?”
নিশি মেয়ের মুখের দিকে তাকাল। নীলা কথাটা বলেই যেন একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল। তার মনে নেই বাবা পানি খেতে ভুলতেন কি না। হয়তো মায়ের মুখে কোনো একদিন শুনেছিল।
নিশি গ্লাসটা তুলে একটু সরিয়ে রাখল।
“হ্যাঁ। মনে করিয়ে দিতে হতো।”
তারা দুজন পাশাপাশি বসে খেতে লাগল। দ্বিতীয় থালার খাবার কেউ ছুঁল না।
খাওয়া শেষে নীলা নিজের থালা ধুয়ে রেখে গেল। মিশি তখন পড়ার টেবিলে বসে ছিল। নিশি দ্বিতীয় থালাটা তুলতে গিয়ে দেখল, ভাতের পাশে মাছের কাঁটাগুলো আলাদা করে রাখা। ছোট ছোট কাঁটা, এক পাশে গুছিয়ে রাখা—ঠিক যেভাবে অভিক খেত।
নিশি থালাটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল।
তারপর রান্নাঘরে গিয়ে কল খুলল।
পানি পড়তে লাগল থালার ওপর। নিশি কাঁটাগুলো ধুয়ে ফেলল, মাছের ঝোলের দাগ মুছল, তারপর থালাটা অন্যগুলোর পাশে উল্টো করে রাখল।
রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে মিশি বাবার পুরোনো ছবিটা দেয়াল থেকে নামিয়ে ধুলো মুছে আবার ঝুলিয়ে দিল। নীলা ছবির নিচে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।
নিশি ঘরে ঢুকে দেখল, দুই মেয়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে।
“মা,” মিশি বলল, “কাল থেকে আমরা তিনজন একসঙ্গে খাব। তুমি আর একা বসবে না।”
নিশি উত্তর দিল না। ছবির নিচে রাখা ছোট টেবিলটার দিকে তাকাল। টেবিলের ওপর দ্বিতীয় থালাটা শুকিয়ে রাখা।
পরদিন সকালে সে চাল ধুতে গিয়ে অভ্যাসবশত এক মুঠো বেশি নিয়ে ফেলেছিল। কিছুক্ষণ হাতের মধ্যে চালগুলো ধরে থাকল। তারপর সেগুলো আবার হাঁড়িতে ঢেলে দিল।
দুপুরে তিনজন একসঙ্গে খেতে বসল।
অভিকের চেয়ারটা জানালার পাশে খালি রইল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।