শেষ গল্পকথকের সন্ধানে
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ২৮ জুলাই, ২০২৬
অনেক বছর পর গ্রামে ফিরে অভিকের প্রথমেই মনে হলো, গ্রামটা আছে ঠিকই, কিন্তু ভেতরে কোথাও যেন একটা ফাঁকা তৈরি হয়েছে।
রাস্তা পাকা হয়েছে, ইটের পর ইট সাজিয়ে নতুন নতুন বাড়ি উঠেছে, বাজারটাও আগের চেয়ে অনেক বড়। তবু সন্ধ্যাটা আর আগের মতো নেই। আগে এই সময়টায় প্রতিটা উঠোনে মানুষ বসত। হ্যারিকেনের আলোয় মুখ দেখা যেত, গল্প হতো, থেকে থেকে হাসির শব্দ ভেসে আসত। এখন সন্ধ্যা নামলে বেশিরভাগ বাড়ির দরজাই বন্ধ থাকে। ভেতরে আলো জ্বলে ঠিকই, কিন্তু সে আলো মানুষের মুখে পড়ে না, পড়ে মোবাইলের স্ক্রিনে।
হাঁটতে হাঁটতে অভিক এসে দাঁড়াল পুরোনো বটগাছটার নিচে।
এই গাছটার নিচেই তার কত সন্ধ্যা কেটেছে। স্কুল থেকে ফিরে ব্যাগটা কোনোমতে ঘরে ছুড়ে দিয়েই দৌড়। ততক্ষণে গাছের নিচে ভিড় জমে যেত। আর ঠিক মাঝখানে বসতেন রহিম দাদু।
মানুষটার কোনো বই ছিল না। অথচ মনে হতো, দুনিয়ার সব গল্প যেন তার বুকের ভেতর গুছিয়ে রাখা আছে।
কখনো বেহুলা-লখিন্দরের গল্প, কখনো জিন-পরির, কখনো এমন সব ঘটনা, যা শুনে গা ছমছম করত আর মনে হতো, সত্যিই কি এমন হয়েছিল?
ছোটবেলায় অত ভাবত না কেউ। গল্প ভালো লাগলেই হলো। বাড়ি ফেরার পথে সেই একই গল্প আবার নিজেদের মতো করে বদলে নিত সবাই। একজন যেখানে শেষ করত, আরেকজন সেখান থেকেই নতুন একটা জুড়ে দিত। একটা গল্প থেকে জন্ম নিত আরেকটা গল্প।
আজ সেখানে শুধু একটা ভাঙা বেঞ্চ পড়ে আছে। চারপাশ ধু-ধু ফাঁকা। পাশের চায়ের দোকানটা আছে, শুধু মুখগুলো আর চেনা নয়।
এক কাপ চা নিয়ে বেঞ্চটায় বসতেই দোকানি জিজ্ঞেস করলেন,
"নতুন আইছেন নাকি?"
অভিক হাসল।
"না, এই গ্রামেরই ছেলে। অনেক বছর বাইরে ছিলাম। আচ্ছা, রহিম দাদু কেমন আছেন, জানেন?"
লোকটা চায়ের কাপ ধুতে ধুতে একটু থামলেন। তারপর আস্তে করে বললেন,
"নাই। তিন বছর হইলো আল্লাহ নিয়া গেছে।"
অভিক আর কিছু বলতে পারল না। গরম চায়ের ধোঁয়াটা চোখের সামনে কেমন ঝাপসা লাগল।
দোকানি নিজে থেকেই বললেন,
"শেষের দিকে প্রায় রোজ আইসা বসত। কিন্তু হুনার মানুষ পাইত না। সবাই মোবাইল টিপে। একদিন আমারে কইতাছিল, আমার লগে লগে গল্পগুলাও বুঝি মইরা যাইব।"
কথাটা বুকের ভেতর কোথাও গিয়ে বিঁধল।
পরদিন সকালে অভিক গেল রহিম দাদুর বাড়িতে। টিনের ছোট ঘর, উঠোনে একটা বুড়ো আমগাছ দাঁড়িয়ে। বারান্দায় বসে ছিলেন দাদুর ছেলে।
অভিককে দেখেই তিনি চিনতে পারলেন।
"তুমি অভিক না? সবসময় সামনে বইসা গল্প শুনতা। তোমার কথা আব্বা কইতো।"
এত বছর পরও কেউ তাকে মনে রেখেছে, ভাবতেই মনটা ভালো হয়ে গেল অভিকের।
কিছুক্ষণ পর তিনি ঘর থেকে একটা পুরোনো টিনের ট্রাঙ্ক এনে খুললেন। ভেতরে কয়েকটা হলদে হয়ে যাওয়া খাতা, কিছু পুরোনো ছবি আর ছেঁড়া কাগজ।
"আব্বা মাঝে মাঝে দুই-এক লাইন লিখা রাখত। কইত, যদি কোনোদিন গলা না চলে, কাগজ দেখলে যদি মনে পড়ে।"
অভিক একটা খাতা খুলল। এক পাতায় কাঁপা হাতে লেখা,
"নদী কথা বলে, যদি কেউ মন দিয়া শোনে..."
আরেক পাতায়,
"সবচেয়ে বড় ভূত হইল মানুষের লোভ।"
অনেক পাতায় শুধু একটা লাইন, একটা শব্দ। তবু কী আশ্চর্য, ওই কয়েকটা শব্দ পড়তেই কানের কাছে পুরোনো গল্পগুলো আবার বাজতে শুরু করল। যেন বটগাছের নিচে বসে রহিম দাদু আবার বলছেন।
সেদিনই অভিক ঠিক করল, একবার চেষ্টা করে দেখবে।
পরের শুক্রবার বিকেলে গ্রামের প্রাইমারি স্কুলের বারান্দায় ছোট্ট একটা গল্পের আসর বসল। প্রথম দিন এল মাত্র ছয়জন।
একটা বাচ্চা শুরুতেই জিজ্ঞেস করল,
"আঙ্কেল, এই গল্প ইউটিউবে আছে?"
অভিক হেসে ফেলল।
"না, এই গল্প ইউটিউবে পাওয়া যায় না। এটা শুধু মুখে মুখে বেঁচে থাকে।"
তারপর সে বলতে শুরু করল রহিম দাদুর সেই নদীর গল্পটা।
শুরুতে বাচ্চাগুলো উসখুস করছিল। কিন্তু একটু পরেই একজন বলে উঠল,
"তারপর কী হইল?"
আরেকজন উঠে এসে একদম সামনে বসল।
গল্প শেষ হতেই ছয়জন একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল,
"আরেকটা বলেন!"
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে অভিকের মনে হচ্ছিল, রহিম দাদু ওপরে কোথাও থেকে এই দৃশ্যটা দেখছেন আর মুচকি হাসছেন।
তারপর থেকে প্রতি শুক্রবার আসর বসতে লাগল। শুধু বাচ্চারা নয়, আস্তে আস্তে বয়স্করাও আসতে শুরু করলেন। কেউ শোনালেন ছোটবেলার গল্প, কেউ শোনালেন মুক্তিযুদ্ধের সময়কার স্মৃতি, কেউ শোনালেন এমন এক লোককথা, যা কোনো বইয়েই লেখা নেই।
অভিক একটা নতুন খাতায় সব লিখে রাখতে শুরু করল।
তখন সে বুঝতে পারল, মানুষ চলে গেলে শুধু মানুষটাই হারায় না। তার সঙ্গে সঙ্গে কত স্মৃতি, কত গল্প, কত ইতিহাস যে নিঃশব্দে হারিয়ে যায়, তার কোনো হিসেব থাকে না।
একদিন এক বৃদ্ধ গল্প বলতে বলতে থেমে গেলেন। চোখ মুছে বললেন,
"অনেক দিন পর মনে হইতাছে, গ্রামে আবার আগের মতো সন্ধ্যা নামছে।"
অভিক তাকাল বটগাছটার দিকে।
গোল হয়ে বসে আছে একদল বাচ্চা। কেউ মন দিয়ে শুনছে, কেউ প্রশ্ন করছে, কেউ গল্পের শেষটা নিজের মতো করে ভেবে নিচ্ছে।
দৃশ্যটা দেখে তার নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল।
হয়তো গল্পের নিয়মটাই এমন।
একজন বলে যায়, আরেকজন শুনে রাখে। তারপর কোনো এক সন্ধ্যায় সেই শ্রোতাই হয়ে ওঠে নতুন গল্পকথক। এভাবেই গল্প বেঁচে থাকে। গ্রামের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।