এটি অভিক ও নিশির কাহিনি—জীবন, ভালোবাসা আর মৃত্যুর দরজায় দাঁড়িয়ে শেষ প্রশ্নের গল্প।
অভিক ছোটবেলা থেকেই ছিল দুষ্টু আর প্রাণবন্ত। স্কুলের মাঠে দৌড়ঝাঁপ, গলির ছেলেদের সাথে খেলাধুলা, আর মায়ের আঁচলের আড়ালে নিরাপদ শৈশব। কিন্তু জন্ম থেকেই তার হৃদপিণ্ড ছিল দুর্বল। চিকিৎসকেরা বলেছিলেন—“সতর্ক থাকতে হবে।” কিন্তু শিশু বয়সে কে আর তা মানে?
কৈশোরে উঠতে না উঠতেই শরীর তাকে মনে করিয়ে দিল—সে আর সবার মতো নয়। হঠাৎ দৌড়াতে গিয়ে বুক ধড়ফড়, সিঁড়ি উঠলেই শ্বাসকষ্ট। বন্ধুদের হাসি-ঠাট্টার আড়ালে কষ্ট লুকাতো অভিক। কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভয় জমে যাচ্ছিল।
কলেজ জীবনে প্রথমবার অভিকের দেখা হলো নিশির সাথে। বৃষ্টিভেজা বিকেল, লাইব্রেরির সিঁড়িতে বই হাতে দাঁড়ানো সেই মেয়েটির চোখে ছিল অদ্ভুত এক শান্তি। অভিক প্রথমবার বুকের ব্যথার বাইরে অন্য এক ব্যথা অনুভব করলো—ভালোবাসার।
নিশির সাথে বন্ধুত্ব থেকে প্রেমে রূপান্তর হলো অচিরেই। অভিক যখনই অসুস্থ হতো, নিশি তার পাশে বসে হাত ধরে বলতো,
“তুমি ভেবো না, আমি আছি।”
অভিক জানতো, এই মেয়ে ছাড়া পৃথিবী শূন্য।
দু’জনে একসাথে কত স্বপ্ন বুনেছিল,
একটা ছোট্ট বাড়ি, বারান্দায় ফুল, সন্ধ্যায় দু’কাপ চা, আর অনেক গল্প।
অভিক বলতো,
“আমার হার্ট হয়তো দুর্বল, কিন্তু তোমার জন্য হৃদয়টা সবচেয়ে শক্ত।”
নিশি হাসতো—আর সেই হাসি অভিকের অসুখ ভুলিয়ে দিত।
তবে শরীরের শত্রু যে সহজে ছাড়বে না, তা কে জানতো?
হাসি-আড্ডার মাঝেই মাঝে মাঝে অভিক হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যেত, বুক চেপে বসে পড়তো।
ডাক্তার বারবার সতর্ক করতো—“বেশি চাপ নিও না, সময় হলে অপারেশন করতে হবে।”
কিন্তু অভিক ভাবতো—“জীবন এত ছোট, ভালোবাসা বাঁচাতে অপারেশনের দরকার নেই, নিশি-ই আমার ওষুধ।”
একদিন অফিস থেকে ফেরার পথে হঠাৎ তীব্র ব্যথা বুক বিদীর্ণ করে দিল। রাস্তার মাঝেই লুটিয়ে পড়লো অভিক। চারপাশে হৈচৈ, মানুষজন দৌড়ঝাঁপ।
অ্যাম্বুলেন্স এলো, নিশি কেঁদে ভিজে গেল।
আইসিইউতে ঢোকার সময় দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে নিশি চিৎকার করে বললো,
“অভিক, আমাকে ছেড়ে যেও না…!”
কিন্তু দরজা বন্ধ হয়ে গেল। অভিকের চোখে ভেসে রইলো কেবল তার অশ্রুসিক্ত মুখ।
ভেতরে কেবল মেশিনের শব্দ—বিপ… বিপ…
সাদা আলো, ঠান্ডা বাতাস, আর চারদিকে মৃত্যুর গন্ধ।
এক বৃদ্ধা নার্সের হাত ধরে কাঁদছিলেন,
“আমি মরতে চাই না।” এক যুবক শ্বাসের জন্য হাঁপাচ্ছিল। মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ এখানে প্রতিদিনের অভ্যাস।
ডাক্তাররা দৌড়ঝাঁপ করছে, নার্সরা ইনজেকশন দিচ্ছে।
কারও কণ্ঠে শোনা গেল,
“Pressure dropping… hurry up!”
সবাই প্রাণপণ চেষ্টা করছে।
কিন্তু অভিকের ভেতরে অদ্ভুত এক শান্তি নেমে এলো। সে বুঝলো—এই লড়াই আর তার জন্য নয়।
বাইরে থেকে নিশির কণ্ঠ ভেসে এলো,
“ডাক্তার, আমার অভিককে বাঁচান! আমি ওকে ছাড়া বাঁচতে পারবো না।”
অভিকের চোখে জল এসে গেল।
মনে মনে বললো,
“নিশি, আমি থাকবো তোমার চারপাশে, বাতাসে, আলোয়, স্বপ্নে।”
অভিক জানালার বাইরে তাকালো। সূর্য অস্ত যাচ্ছিল, গোধূলি রঙ আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে।
তার মনে হলো,
“কি সুন্দর মুহূর্ত! এমন সময়ে মৃত্যু হলে, সেটাই তো জীবনের পূর্ণতা।”
চোখের সামনে ভেসে উঠলো, শৈশবের হাসি, মায়ের মমতা, বন্ধুদের আড্ডা, নিশির প্রথম হাসি, হাত ধরে হাঁটা বিকেল। সব স্মৃতি মিলেমিশে যেন আলো হয়ে ঝলসে উঠলো।
অভিক অনুভব করলো চারপাশের গাছ যেন হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, ফুল ঝরে পড়ছে তার কপালে, হাওয়া বলছে, “ফিরে এসো…”
কিন্তু সে জানে—ফেরার পথ আর নেই।
সে এগিয়ে যাচ্ছে অচেনা এক আলোর ভেতর।
সবকিছু থেমে গেল। মেশিনের শব্দ মিলিয়ে গেল নিস্তব্ধতায়।অভিকের ঠোঁট নীরবে বললো,
“তখন কি আর ফেরা সম্ভব?”
নিশির কান্না ভরিয়ে দিল সারা হাসপাতাল।
আকাশের গোধূলি ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঢেকে গেল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।