না পাঠানো চিঠির শহর
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। এপ্রিল ২২, ২০২৬
শহরটা এখন আগের মতো শব্দ করে না, যদি “আগে” বলে সত্যিই কোনো স্থির সময়কে বোঝানো যায়। এখন শব্দগুলো বাইরে শোনা যায় না; তারা কোথাও ভেতরে জমা হতে থাকে, ধীরে ধীরে, নীরবে। বিষয়টা হয়তো শহরের পরিবর্তন নয়, বরং শোনার অভ্যাসের বদল।
সে একসময় চিঠি লিখত। নিয়মিত না, আবার পুরোপুরি অনিয়মিতও না। মাঝামাঝি কোথাও। কখনো পূর্ণ চিঠি, কখনো কয়েক লাইনের চিরকুট। পাতার পর পাতা ভরে উঠত, কিন্তু প্রায়ই মাঝপথে থেমে যেত। দেখে মনে হতো, বাক্যগুলো ঠিক গন্তব্য খুঁজে পাচ্ছে না; বা অনুভূতিটাই ভাষার ভেতর ঠিকভাবে বসতে পারছে না।
লিখতে গিয়ে ভুল হতো, নতুন করে শুরু করত। পৃষ্ঠার একপাশ শেষ করে অন্য পাশে চলে যেত লেখা, পরে হঠাৎ মনে পড়ত—কিছু একটা বাদ গেছে। তখন আবার “পুনশ্চ:” দিয়ে নতুন পাতা। যেন জীবন নিজেই বারবার নিজের খসড়া বদলাচ্ছে।
চিঠির ভাঁজে কখনো শুকনো শিউলি থাকত। কখনো গন্ধরাজের পাপড়ি। আর কখনো দু’টাকার ভিউকার্ড—হাতে আঁকা ছবি, রং অসম্পূর্ণ, কিন্তু মনোযোগে পূর্ণ। পাশে ছোট ছোট নোট: প্রিয় ফুল, প্রিয় রং।
“যেদিন তুমি আমার হবে,” সে হয়তো লিখত, “সেদিন কোনো একদিন হঠাৎ তুমি মনে করবে… আমাকে চমকে দেবে।”
খামের উপর নাম লেখার সময় তার হাত কখনো কাঁপত না, এটা একটু অদ্ভুত শোনালেও সত্যি। সবচেয়ে স্থির থাকত এই অংশটুকু। নামটা যত্ন করে লেখা হতো, যেন সেটাই সবচেয়ে নিশ্চিত জিনিস।
সে মাঝে মাঝে বইয়ের দোকানে দাঁড়িয়ে থাকত। কবিতা বা গল্পের বই খুলে দাগ দিত, পৃষ্ঠা নম্বর মনে রাখত। মনে হতো, কোনো একদিন সেই অংশগুলো পড়ে শোনাবে। মানুষটা শুনবে, চুপ করে থাকবে—আর সেই নীরবতাই হয়তো উত্তর হয়ে থাকবে।
সময় এগিয়েছে। শহর বদলেছে, মানুষও। কিন্তু তার লেখা চিঠিগুলো আর কোথাও পাঠানো হয়নি।
খামের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু ডাকবাক্সে হাত যাচ্ছে না। কাগজগুলো জমছে—ড্রয়ারে, খাতার ভাঁজে, টেবিলের কোণে। কিছু চিঠি অর্ধেক লেখা, কিছু শুরুই হয়নি।
কারণটা সে নিজেও জানে না। হয়তো সাহসের অভাব, হয়তো সিদ্ধান্তের মুহূর্তটা কখনোই আসে না ঠিকভাবে। কিংবা যাকে লেখা হচ্ছে, তার উপস্থিতি আর অনুপস্থিতির মাঝখানের জায়গাটা এতটাই বড় ছিল যে সেখানে ভাষা পৌঁছায় না।
একসময় সে চিঠিগুলো নিজের জন্যই পড়ত। তখন একটা প্রশ্ন ভেতরে ভেসে উঠত—এগুলো কি সত্যিই কাউকে লেখা, নাকি নিজের সঙ্গে কথা বলার একটা উপায়?
শিউলিগুলো শুকিয়ে যেত, গন্ধরাজের গন্ধ মিলিয়ে যেত। তবু কাগজগুলো ফেলে দেওয়া যেত না।
একদিন হঠাৎ বৃষ্টি নামল। জানালার কাচ কেঁপে উঠছিল। সে পুরোনো খাতার পাতা উল্টাচ্ছিল। সেখানে একটা চিঠি—অসম্পূর্ণ, অগোছালো, কিন্তু খুব চেনা।
লিখা ছিল—“একদিন তোমাকে প্রতিদিন চিঠি লিখতাম…” এরপর থেমে গেছে।
সে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর খাতাটা বন্ধ করল। বাইরে বৃষ্টি চলছে। ভেতরের শব্দটা আরেকটু ভারী মনে হলো।
পরদিন সকালে সে সব চিঠি একসাথে করল। ড্রয়ার বন্ধ করার সময় থামল।
সে জানালার দিকে তাকাল। শহরটা একই রকম আছে। কিন্তু আর নতুন খামে নাম লেখার তাড়া নেই। তবু কোথাও একটা নাম থেকে যায়, যেটা মুছে ফেলার চেষ্টা করলেও পুরোপুরি মুছে যায় না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।