অল্প একটু জীবন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প | ৫ অক্টোবর ২০২৬
অভিক কথাটা কাউকে বলত না। এমনকি নিশিকেও না।
সকালে ঘুম থেকে উঠেই তার প্রথম কাজ ছিল মোবাইলে সময় দেখা। তারপর বিদ্যুৎ বিল, বাজারের তালিকা, মেয়ের পড়াশোনা, ব্যাংকের কাজ, অফিসের চাপ—একটার পর একটা চিন্তা মাথায় এসে বসত। একসময় অভিকের সকাল অন্যরকম ছিল। ছুটির দিনে ঘুম থেকে উঠে বারান্দায় বসে চা খেত। পুরোনো গান শুনত। বই পড়ত। কখনো হঠাৎ নিশিকে বলত, “চলো, আজ কোথাও ঘুরে আসি।”
নিশি রান্নাঘর থেকে বলত, “কোথায়?”
“জানি না। বের হলেই একটা জায়গা পাওয়া যাবে।”
সেই মানুষটা এখন কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।
এক শুক্রবার সকালে নিশি চা নিয়ে বারান্দায় এসে বলল, “চা।”
অভিক খবরের কাগজে চোখ রেখে বলল, “রেখে যাও।”
নিশি কাপটা টেবিলে রাখল। “আজ অফিস নেই?”
“না।”
“তাহলে একটু বসবে?”
অভিক কাগজ নামিয়ে তাকাল। “বসব কী নিয়ে?”
নিশি হেসে বলল, “কিছু নিয়ে না। আমার সঙ্গে।”
অভিক খবরের কাগজটা আবার তুলে নিল। “অনেক কাজ পড়ে আছে।”
নিশি আর কিছু বলল না।
কিছুক্ষণ পর কাপের দিকে তাকিয়ে অভিক দেখল, চা ঠান্ডা হয়ে গেছে। একসময় সে এই ঠান্ডা চা নিয়ে নিশিকে কতবার বিরক্ত করত।
“তুমি চা বানিয়ে রেখে দাও কেন? গরম থাকতে খেতে হয়।”
নিশি বলত, “তুমি তো ফোনে থাকো।”
আজ কথাটা মনে পড়ে অভিকের নিজের কাছেই কেমন লাগল।
দুপুরে আলমারি পরিষ্কার করতে গিয়ে নিশি একটা পুরোনো বাক্স বের করল। ভেতরে অভিকের ক্যামেরা। ধুলো জমে আছে।
“এটা ফেলে দিই?”
অভিক ঘুরে তাকাল। “না।”
“তুমি তো ব্যবহারই করো না।”
“একসময় করতাম।”
“জানি।”
নিশি ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে বলল, “আবার করো।”
অভিক একটু হেসে বলল, “এই বয়সে আবার শখ?”
নিশি তার দিকে তাকিয়ে বলল, “শখ করার বয়স চলে গেলে মানুষ কী করে?”
অভিক বলল, “দায়িত্ব পালন করে।”
“শুধু?”
অভিক উত্তর দিল না।
নিশি ক্যামেরাটা পরিষ্কার করে টেবিলে রেখে দিল।
সেদিন রাতে ঘুম আসছিল না অভিকের। একসময় সে ছবি তুলত, বই কিনত, গান শুনত। নিশিকে নিয়ে রিকশায় করে শহরের এদিক-ওদিক ঘুরত। বৃষ্টির দিনে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চা খেত। তারপর সংসার এসেছে। দায়িত্ব এসেছে। টাকার হিসাব এসেছে। একটা শখ বাদ গেছে। তারপর আরেকটা। শেষ পর্যন্ত নিজের জন্য সময়টুকুও বাদ গেছে।
পরদিন সকালে নিশি বলল, “আজ বিকেলে একটু বাইরে যাবে?”
অভিক বলল, “কোথায়?”
“জানি না।”
অভিক তাকিয়ে রইল।
নিশি হেসে বলল, “তুমি তো একসময় এটাই বলতে।”
বিকেলে তারা বের হলো। কোনো দূরের জায়গায় নয়। বাসার কাছের একটা লেকের পাশে গিয়ে বসেছিল।
অভিক অনেকক্ষণ চুপ করে পানির দিকে তাকিয়ে ছিল।
নিশি বলল, “কী ভাবছ?”
“কিছু না।”
“তোমার ‘কিছু না’টা এখন অনেক বড় হয়ে গেছে।”
অভিক হেসে ফেলল। কিছুক্ষণ পর বলল, “জানো, আমি ক্লান্ত।”
নিশি চুপ করে রইল।
অভিক বলল, “আগে ভাবতাম, ক্লান্ত হলে একটু বিশ্রাম নেব। এখন মনে হয়, বিশ্রাম নিলেই যেন কাজ জমে যাবে।”
নিশি ধীরে বলল, “কাজ তো জমবেই।”
“তাহলে?”
“সব কাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষা করলে তোমার নিজের জন্য কোনো দিনই আসবে না।”
অভিক কিছু বলল না।
ফেরার সময় রাস্তার পাশে একটা ছোট বইয়ের দোকান দেখে দাঁড়িয়ে গেল। একটা বই হাতে নিল। দাম দেখল। তারপর রেখে দিল।
নিশি বলল, “কিনলে না?”
অভিক বলল, “এই মাসে একটু টানাটানি।”
নিশি বলল, “ঠিক আছে।”
কথাটা খুব সাধারণ ছিল। কিন্তু বাড়ি ফেরার পথে অভিকের মনে হলো, নিশি তাকে বই না কেনার জন্য একবারও দোষ দিল না। বরং তার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকার সময়টুকুই যেন যথেষ্ট মনে করেছে।
সেই রাতে অভিক একটা ছোট সিদ্ধান্ত নিল। জীবন বদলে ফেলবে না। শুধু প্রতিদিন নিজের জন্য দশ মিনিট রাখবে।
প্রথম দিন দশ মিনিট বই পড়ল। দ্বিতীয় দিন বারান্দায় বসে গান শুনল। তৃতীয় দিন ক্যামেরাটা হাতে নিয়ে ছাদে উঠল। চতুর্থ দিন কিছুই করতে পারেনি। অফিস থেকে ফিরতে রাত হয়ে গিয়েছিল।
নিশি জিজ্ঞেস করল, “আজ দশ মিনিট?”
অভিক জুতো খুলতে খুলতে বলল, “হয়নি।”
নিশি বলল, “কাল হবে।”
অভিক তার দিকে তাকাল।
“তুমি রাগ করলে না?”
“দশ মিনিটের জন্য রাগ করতে যাব কেন?”
অভিক হেসে ফেলল।
কয়েক মাস পর এক বিকেলে অভিক বারান্দায় বসে ছিল। হাতে সেই পুরোনো ক্যামেরা।
নিশি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে বলল, “কী করছ?”
অভিক বলল, “তোমার একটা ছবি তুলব।”
নিশি অবাক হয়ে দাঁড়াল। “আমার?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
অভিক ক্যামেরা চোখের সামনে তুলে বলল, “অনেক বছর ধরে সংসারের ছবি তুলেছি। আজ একটু আমাদের ছবি রাখি।”
নিশি কিছু বলল না। শুধু জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
অভিক ছবি তুলল।
ছবিটা কেমন হয়েছিল, সে জানত না। কিন্তু ক্যামেরার স্ক্রিনে নিশির মুখটা দেখে অনেকক্ষণ চুপ করে রইল।
সেদিন রাতে ঘুমানোর আগে নিশি জিজ্ঞেস করল, “কাল কী করবে?”
অভিক একটু ভেবে বলল,
“জানি না।”
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।