ঝড়ে দাঁড়িয়ে থাকা দুই হাত
মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬
সেই বিকেলে আকাশে কোনো সতর্কবার্তা ছিল না। বরং অদ্ভুত পরিষ্কার। দিগন্ত এত খোলা যে মনে হয় আজ কিছুই ঘটবে না। রোদ ঢেউয়ের মতো ছড়িয়ে আছে, বাতাসে মাটির গন্ধ—শুকনো পাতা আর কাঁচা মাটির মিশ্রণ। দূরে ধানের খড় ধীরে নড়ছে। মাঠের ওপরে স্থিরতা আছে, যা ভেতরে ভেতরে কিছু জমায়।
নিশির চুল সেদিন পুরো খোলা ছিল না, আবার বাঁধাও না। এলোমেলো গোছা বারবার চোখে এসে পড়ছে। সে বিরক্ত হয়ে কানের পাশে গুঁজে দিচ্ছে। হাতের নখে রঙের হালকা দাগ—গতরাতেও আঁকছিল।
ডালের দিকে তাকিয়ে সে বলে,
“ওটা দেখো—হাতের মতো না?”
অভিক চোখ কুঁচকে তাকায়। তার ডান হাতে ঘড়ি। আজ ঘড়িটা উল্টো পরে ফেলেছে—কাঁটা ভেতরের দিকে। সে খেয়াল করেনি।
“তুমি সবকিছুর ভেতরে মানুষ খুঁজে পাও,” সে বলে।
নিশি হালকা হাসে। কিছু বলে না।
তারা চারুকলা কলেজের তৃতীয় বর্ষে। রঙ নিয়ে তর্ক করতে গিয়েই পরিচয়। অভিক আলো ঠিক যেমন পড়ে, তেমন আঁকতে চায়। নিশি বলে, আলো কখনও একরকম থাকে না। সে আঁকে অনুভূতির পরিবর্তন।
প্রথম বছর তর্ক ছিল। দ্বিতীয় বছর একসাথে চা খাওয়া। তৃতীয় বছরে এসে কথা কমে গেছে।
কমে গেছে মানে ফুরিয়ে যায়নি। কিছু কথা জমে থাকে—আঁকা না হওয়া রেখার মতো।
মহিমপুর পৌঁছাতে তাদের দেরি হয়ে যায়। বাসের ভিড়ে অভিকের শার্টের উপরের বোতাম ছিঁড়ে গেছে। সে টের পায় যখন বাতাস বুকের ভেতর ঢুকে ঠান্ডা লাগায়। নিশি আঙুল দিয়ে ছেঁড়া জায়গাটা ছুঁয়ে দেখে, তারপর হাত সরিয়ে নেয়।
নিশি ব্যাগ থেকে হাতে তৈরি কাগজ বের করে। কাগজে আঠার হালকা গন্ধ। কাঠকয়লা ঘষলে আঙুলে শুকনো ধোঁয়ার মতো গন্ধ লাগে। সে দ্রুত আঁকতে শুরু করে—গাছ, আকাশ, আলোর দাগ। ডালের কাছে এসে থেমে যায়।
একটা রেখা অসমাপ্ত থাকে।
অভিক জিজ্ঞেস করে,
“শেষ করছো না?”
নিশি মাথা নাড়ে।
“এখন ভালো লাগছে না।”
তার গলায় এমন এক সুর, যা কথার চেয়ে বেশি কিছু বোঝায়। অভিক বুঝতে পারে, তবু জিজ্ঞেস করে না।
অভিক আজ একটা কথা বলবে ঠিক করেছে। দিল্লির এক চারুকলা বিদ্যালয়ে বৃত্তি পেয়েছে। চিঠিটা তিন দিন আগে এসেছে। একা যেতে হবে। খুব দ্রুত। নিশিকে বলেনি। বলতে গেলেই মনে হয়েছে—রেখাটা ভেঙে যাবে।
সে জুতোয় কাদা ঢুকেছে টের পায়, কিন্তু ঝেড়ে ফেলে না। যেন ইচ্ছে করেই দাঁড়িয়ে থাকে। সময় একটু ধীরে যাক—এটাই চায়।
আকাশ বদলাতে শুরু করে। নীলের নিচে কালো জমে। বাতাস হঠাৎ দিক পাল্টায়। দূরে টিনের চাল কেঁপে ওঠে।
নিশি আকাশের দিকে তাকায়। “মনে হচ্ছে ঝড় হবে।”
অভিক বলে, “আর একটু থাকি।”
প্রথম বৃষ্টির ফোঁটা বড়, ভারী। মাটিতে পড়ে গোল দাগ ফেলে। আচমকা বৃষ্টি ঘন হয়ে আসে। বাতাস শিমুল গাছের পাতায় আঘাত করে।
নিশি স্বতঃস্ফূর্তভাবে অভিকের হাত ধরে। হাত ঠান্ডা।
“চলো!”
“কোথায়?”
চারপাশ খোলা মাঠ। আশ্রয় নেই। মাটি পিচ্ছিল।
নিশি দু-পা এগিয়ে আবার থামে। “আলাদা হলে হয়তো দ্রুত পৌঁছানো যাবে।”
অভিক নড়ে না। তার বুকের ভেতর জমে থাকা কথা হঠাৎ আরও ভারী হয়ে ওঠে। চলে গেলে কী হবে? না বললে কী হবে? থাকলে কী হবে?
বজ্রপাত হয়। সাদা আলো এক মুহূর্তের জন্য সব পরিষ্কার করে দেয়। নিশির মুখে ভয়। অভিমান।
সে বলে,“তুমি কি কোথাও চলে যেতে চাও?”
অভিকের গলা শুকিয়ে যায়। শব্দ আসে না।
আরেকটা বজ্রপাত। শিমুল গাছের মোটা ডালটা দুলে ওঠে।
অভিক এবার শক্ত করে হাত ধরে। “আমি ভয় পাচ্ছি,” সে বলে।
নিশি চোখ বন্ধ করে। ছোটবেলায় বজ্রপাতের পর কত সেকেন্ডে শব্দ আসে গুনত। আজ গোনার সময় নেই। সবকিছু খুব কাছে, খুব জোরে।
বাতাস আরও আছড়ে পড়ে। বৃষ্টি চোখে ঢুকে দৃশ্য ঝাপসা হয়ে যায়। অভিকের ঘড়ির কাঁচে জল জমে কাঁটা দেখা যায় না। সময় যেন থেমে গেছে। নিশি হাত ছাড়ায় না।
হঠাৎ তীব্র শব্দ। সাদা ঝলক।
ভাঙা কাঠের চাপা আঘাত।
তারপর নিস্তব্ধতা।
পরদিন সকালে গ্রামবাসীরা শিমুল গাছের নিচে দুজনকে পায়। হাত ধরা অবস্থায়। পাশে ভাঙা ডাল। ভেজা মাটিতে কাদা আর পাতার গন্ধ। নিশির কাগজ ভিজে নরম হয়ে গেছে। কাঠকয়লার রেখা ছড়িয়ে একাকার। অসমাপ্ত অংশটা এখনো বোঝা যায়—আরেকটু বাড়লেই দুটি রেখা ছুঁতো।
অভিকের আঁকার খাতা খোলা। সাদা পাতার কোণে লেখা—“আজ বলব।”
আর কিছু নয়।
গ্রামের লোকেরা জায়গাটায় ছোট পাথরের বেদি বানায়। ফলকে খোদাই করা হয়—“এখানে দুই হাত ছিল।”
বছর যায়। লোহার বেড়ায় জং ধরে। পাথরে শ্যাওলা ওঠে। শিমুল গাছ আবার নতুন পাতা আনে। ডালের ভাঙা অংশ শুকিয়ে গাঢ় হয়ে গেছে।
বৃষ্টি নামলে এখনো মাটিতে কালো দাগ পড়ে। কেউ কেউ দাঁড়িয়ে থাকে কিছুক্ষণ। দূর থেকে তাকালে ডালটা এমনভাবে বাঁকানো যে মনে হয় আকাশের দিকে বাড়ানো দুই হাত।
কাছে গেলে বোঝা যায়—ওটা ভাঙা।
অসমাপ্ত রেখার মতো।
#ঝড়ে_দাঁড়িয়ে_থাকা_দুই_হাত #বাংলা_ছোটগল্প
#সমকালীন_সাহিত্য #প্রেম_ও_দ্বিধা #অসমাপ্ত_রেখা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।