এই তো সেদিন, আড্ডার দেশের সীমান্ত পেরিয়ে যখন ঘরে পৌঁছালাম, তখন প্রায় ভোর। (আড্ডার দেশ চেনো না? ওই তো আবুলের চায়ের দোকান আর বিষুর সেলুনের মাঝে!) একটু পান্তাভাতের ঘুম ঘুমিয়ে, বাড়ির পেছনের প্রশান্ত মহাসাগরে তিনটে ডুব দিতে গিয়ে দেখি এক নীল তিমি হাডুডু খেলায় পায়ে সুড়সুড়ি দিচ্ছে।
কোন রকমে কথাকলি চালে দুই দান হাডুডু খেলতে পারে; উঠে মাথা মুছতে মুছতেই দেখি পঙ্খীরাজ এসে হাজির। আমায় নাকি বেড়াতে নিয়ে যাবে। বেড়াতে তো আমি ভালোবাসি। তাই চড়ে বসলাম। তারপর এ দেশ সে দেশ তিন মুলুক ঘুরে পঙ্খীরাজ নেমে এল তেপান্তরের মাঠে।
সেখানে দেখি অনেকগুলো হাফপ্যান্ট পরা ছেলে ক্রিকেটের স্টাম্পের মতো বইয়ের ওপর বই, তারও ওপর বই সাজিয়ে হাতে একটা রাবারের বল নিয়ে ক্রিকেট খেলছে। আর খানিকটা দূরে কিছু কিশোরী ফ্রক পরে খেলছে কানা মাছি। লম্বা তাদের বিনুনী, তাতে লাল, নীল, হলুদ রঙের ফিতে। সেই ফিতে হাওয়ায় ওড়ে, আর একটা একটা করে চড়ুই পাখি বেড়িয়ে আসে তা থেকে।
আমি বললাম, “আমায় খেলতে দাও না...”
ওরা বলল, “না। তুমি বড় হয়ে গেছ...”
মনের দুঃখে আবার চড়ে বসলাম পঙ্খীরাজে। আবার উড়ান। কিছু সমুদ্র, কিছু মরুভূমি পেরিয়ে যখন আমি তিতাস নদীর ধারে পৌঁছালাম, তখন বাতাসে মহুয়া ফুল আর জুঁই ফুলের গন্ধের মিশেল, মাটিতে মাতাল হওয়া গন্ধ, যখন আকাশের রামধনু গলে গলে খেতের ফসলের ওপরে ঝরে পড়ছে, আর পাগল হাওয়ার স্রোতে গরম ভাতের গন্ধ — ঠিক তখনই...
ঠিক তখনই, আমার চারপাশে এল সেই চড়ুই পাখির ঝাঁক। এসে বলল, “আমরা হারিয়ে দিয়েছি ব্যাঙমা আর ব্যাঙমীকে। আমাদের ডানায় অদম্য শক্তি। তুমি আমাদের সাথেই থেকো।” আমি হেসে ওদের ঠোঁট থেকে কুড়িয়ে নিলাম লাল, নীল, হলদে স্ফটিক — গোল গোল, ঠিক কাঁচের গুলির মতো দেখতে। সাথেই পেলাম কিছু লাল, নীল, হলুদ বিনুনীর ফিতে। সব কিছু গুঁজে রাখলাম আমার দুই পকেটে।
তারপর...
তারপর ঘরে ফেরা। তারপর ফিরে আসা। ঘরে এসে স্ফটিক আর ফিতের খোঁজে পকেটে হাত দিলে দেখলাম, দুটো পকেটই ফুটো। সব পড়ে গেছে — লাল, নীল, হলুদ স্ফটিক, লাল, নীল, হলুদ ফিতে। কিছুই নেই আর।
বাইরে এসে দেখি পঙ্খীরাজও উড়ে গেছে কোথায়।
আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বললাম, “ওহে, খুঁজে এনে দিতে পারো আমার লাল, নীল, হলুদ স্ফটিক আর লাল, নীল, হলুদ ফিতেগুলো? এনে দিতে পারো আমার কৈশোর?”
কে যেন আড়াল থেকে বলে উঠল,
“না, তুমি তো বড় হয়ে গেছ...” এই তো সেদিন।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।