লেখকঃ মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ধরণঃ ছোটগল্প
তারিখঃ ১৪ অক্টোবর ২০২৫
জীবন যেন এক দীর্ঘ নদী। কেউ ভেসে যায় আনন্দের স্রোতে, কেউ ত্যাগের ঢেউয়ে। কেউ আবার নিঃশব্দে ডুবে যায়— নিজের ভালোবাসার ভারে, অপরের অবহেলার বোঝায়।
অভিক ছিল সেই নদীর মতোই—প্রবাহমান, দানশীল, আর নিরব আত্মসমর্পণের প্রতিমা। ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে সে দিয়েছিল সবকিছু, ফেরত চায়নি কিছুই।
কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে তার একটাই প্রশ্ন—
“এক জীবনে এত কষ্ট কেন?”
বুকের ভেতর প্রচণ্ড ব্যথা। শ্বাস নিতে কষ্ট। হৃদপিণ্ড যেন কারও শক্ত মুঠোয় ধরা।
অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেন কেবল শূন্য রাস্তায় চিৎকার করে যাচ্ছে, আর অভিকের চোখে ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে আলো।
এই তো সেদিন— নিশিকে নিয়ে নতুন ঘরে উঠেছিল সে।
নিশি বলেছিল, “নতুন ঘর, নতুন জীবন, সবকিছুই নতুন।”
অভিক ভেবেছিল, সত্যিই জীবন নতুন করে শুরু হবে।
প্রতিটি সকাল তার কাছে হয়ে উঠেছিল নতুন, প্রতিটি রাত ভালোবাসার আলোকিত প্রদীপ।
কিন্তু নতুন কিছু গড়ার আগে যে পুরোনোকে ভাঙতে হয়—সে বোঝেনি নিশি।
অভিক ছেড়ে এসেছিল শৈশবের খেলাঘর, কৈশোরের আড্ডা, শীতের রাতে ভাইদের সঙ্গে ভাগ করা লেপের উষ্ণতা, মায়ের রান্নাঘর ভরা স্নেহের গন্ধ, বাবার কঠিন অথচ স্নিগ্ধ ছায়া।
এসবই একবার গেলে আর ফেরে না। ফেরে শুধু স্মৃতির ঢেউ—যা বারবার ভাসিয়ে নিয়ে যায় বেদনার তীরে।
তবুও অভিক নিশিকে ভালোবেসেছিল। নিজের স্বপ্নগুলো ভেঙে গড়ে দিয়েছিল নিশির সংসার।
দুটি কন্যার আগমনে সংসার পূর্ণ হয়েছিল, কিন্তু অভিক ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছিল এক নিরব যন্ত্রে—যন্ত্র, যা শুধু দেয়, কিছুই পায় না।
ভোরে অফিস, রাতে মেয়েদের খাওয়ানো, নিশির ছোট খুশির জন্য সব বিলিয়ে দেওয়া—সবই ছিল তার নীরব আত্মসমর্পণ।
আর নিশির চোখে অভিক হয়ে উঠল শুধু টাকা বানানোর মেশিন।
ভালোবাসা নয়, কেবল প্রয়োজন।
অভিক তবু বলত—
“আমি ওকে প্রচণ্ড ভালোবাসি।”
আজ সেই মানুষটা শুয়ে আছে অ্যাম্বুলেন্সের ভেতর। বুকের ভেতর প্রতিধ্বনি উঠছে—
“জীবন তো একটাই, তবে কেন এত কষ্ট?”
কেউ উত্তর দেয় না।
আলো গুলো দূরে সরে যাচ্ছে। শব্দগুলো কানে এসে ভাঙছে টুকরো টুকরো হয়ে।
শরীরটা হালকা লাগছে, চোখের পাতা সীসার মতো ভারী।
হঠাৎ অ্যাম্বুলেন্স থেমে গেল।
সব শব্দ, সব আলো মিলিয়ে গেল এক গভীর নিস্তব্ধতায়।
অভিকের বুক থেকে যেন একটি আর্তনাদ ঝরে পড়ল—
“আমার ছোট মেয়েটার কী হবে? আমি ছাড়া ওর দেখার কেউ নেই… নিশি তো অনেক দূরে চলে গেছে…”
কণ্ঠ থেমে যায়, চোখ স্থির হয়ে যায়।
সবকিছু ঢেকে ফেলে এক শীতল নীরবতা।
আর চারপাশে রয়ে যায় শুধু—
শুধুই অন্ধকার।
অন্ধকারের গভীরে হারিয়ে যায় এক নামহীন আর্তনাদ,
যার প্রতিধ্বনি হয়তো এখনো ভেসে বেড়ায় নিশির নতুন আলোর ঘরে।
#শুধুইঅন্ধকার #ছোটগল্প #enolej_idea #মোহাম্মদজাহিদহোসেন #বাংলাসাহিত্য #ভালোবাসাএবংঅন্ধকার #জীবনেরঅর্থ #মানবিকগল্প
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।