সাতটা পঁয়ত্রিশ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০২৬
রাত দুই পেরিয়ে আড়াই। শীতের এই মাসে ভোর এখনো অনেক দূর। বারান্দায় কেউ দাঁড়িয়ে, আলো পড়েছে রাস্তায়।
সে রেলিং ধরে আছে। সিগারেট ধরানো, কিন্তু টানছে না। ধোঁয়া অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে। মুখ স্থির, চোখ দূরে—কোনো অতীতের খাদে।
আমি জানালায় টোকা দিলাম।
“শব্দটা শুনছিস?” সে ফিসফিস করে বলল।
“কোন শব্দ?”
“নিচে ফটকের। বারবার খোলা-বন্ধ হচ্ছে।”
রাস্তা নিঃশব্দ। দূরে কুকুর ডাকছে। বাতাসে ঝরা পাতা আর কয়লার গন্ধ।
“কিছু শুনছি না,” বললাম।
সে মুখ তুলে হাসল—ছিঁড়ে যাওয়া দাগের মতো। তিন বছর ধরে চিনি এই হাসি।
প্রথম দেখা লিফটে, ২০২২-এর শেষ দিকে। সে পঞ্চম তলায় উঠছিল, হাতে পুরোনো কার্ডবোর্ড বাক্স। লিফট ঝাঁকি খেল। বাক্স ফসকে পড়ল। প্লাস্টিকের কাপ, কলম, ফাইল আর একটা ভাঙা হাতঘড়ি ছড়িয়ে গেল।
কাঁটা আটকে আছে—সাতটা পঁয়ত্রিশ।
“বাবার,” সে বলল। “চলে না। তবু রাখি।”
সেই মুহূর্তে মনে হলো, ঘড়িটা নয়—সে নিজেই কিছু আঁকড়ে ধরে আছে।
নিশির সাথে প্রথম দেখা বাগদানের পর। দরজা খুলে হাসল,
“আপনিই তো লিফট-বন্ধু?”
ভেতর থেকে অভিক চিৎকার করল, “আমি ‘ভূত’ বলিনি!”
নিশি হেসে বলল, “বলেছিলে।”
একদিন বৃষ্টিতে ভিজে দু’জনে ঘরে ঢুকল। নিশি ভাঙা ঘড়িটা হাতে নিয়ে বলল,
“চলো ঠিক করি।”
অভিক স্ক্রু খুলছিল, নিশি টর্চ ধরল। কাঁটা নড়ল না। তবু অনেকক্ষণ চেষ্টা করল।
বিয়ের পর ছোট ফ্ল্যাট। বারান্দায় দুটো মানিপ্ল্যান্ট। একদিন দেখা গেল, একটা শুকিয়ে গেছে।
“পানি দিতে ভুলে গেছি,” নিশি বলল।
অভিক বলল, “আমি তো দিয়েছিলাম।” তারপর চুপ।
অফিসে নতুন বস এল। টার্গেট বাড়ল। একদিন রিপোর্টে ভুল। সবার সামনে অপমান। বাড়ি ফিরে অভিক বলল, “মজা করছিল।”
কিন্তু রাতে ঘুম হলো না। বারবার ফিসফিস করল, “ছাঁটাই করবে।”
এক রাতে হঠাৎ বুক ধড়ফড়। নিশি ফোন করল। হাসপাতালে নেয়া হল। সব পরীক্ষা স্বাভাবিক।
ডাক্তার বললেন, “ভয় শরীরে ঢুকেছে।”
“আমি তো পাগল না।”
“ভয় পেলে মানুষ অসুস্থ হয়,” ডাক্তার হেসে বললেন।
পরের সপ্তাহে মেইল এল—চাকরি শেষ।
নিশি পাশে দাঁড়িয়ে চুপ। অভিক বারান্দায়। আটকে থাকা কাঁটার দিকে তাকিয়ে।
নিশির বাবার অসুখ। গ্রামে যেতে হল। যাওয়ার আগে বলল,
“ফোন করবি? প্রমিস?”
“প্রমিস।”
সকালে গাড়ি চলে গেল। অভিক দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে রইল। হাত তুলল না।
পরদিন সে ফোন ধরল না। বিকেলে নিশি আমাকে ফোন করল। দরজা খোলা। অভিক বিছানায়। চোখ খোলা, কিন্তু দেখছে না। টেবিলে খালি ওষুধের পাতা।
একটা কাগজ—উল্টো দিকে লেখা, “নিশি”।
নিশি এখন স্কুলে কাজ করে, কাউন্সেলিং শিখছে। একদিন দেখলাম, একটি ছেলে এসে বসল। চুপচাপ।
নিশি তার কাঁধে হাত রাখল। বলল,
“আমি শুনছি।”
আমার টেবিলে এখনো সেই ভাঙা ঘড়ি।
কাঁটা আটকে আছে—সেই সময়ে।
আমি মাঝে মাঝে সেটার পাশে বসে থাকি।
মনে হয়, কেউ খুব আস্তে দরজা খুলছে—
আর কেউ অপেক্ষা করছে, শুধু কেউ শুনবে বলে।
কখনও কখনও শুধু শোনা হলই যথেষ্ট।
#ভয়লুকোনা #সাতটাপঁয়ত্রিশ #মানসিকস্বাস্থ্য #আমি_শুনছি
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।