চোখের জলে জ্বলা নদী
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। এপ্রিল ২৩, ২০২৬
সন্ধ্যা নামছিল ধীরে ধীরে। দূরের বসতিতে একটা দুটো করে বাতি জ্বলে উঠছে—নরম, হলুদ আলো। জানালার ধারে বসেও পিঠটা সোজা রাখতে পারছিলাম না।
ঠিক তখনই ও এসে দাঁড়াল সামনে।
কিছু বলল না। শুধু তাকিয়ে রইল। আমার ছোট মেয়েটা। ওর চোখ দুটো ভেজা—চোখের কোণে পানি জমে আছে, গড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায়।
“বাবা…”
ডাকটা খুব ছোট, কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা টান লাগল। আমি হাত বাড়াতেই ও এগিয়ে এল। কোলে তুলে নিতেই বুঝলাম—ওর গাল ঠান্ডা, ভেজা। কান্নাটা খুব বড় কিছু নয় হয়তো, তবু ওর কাছে সেটাই পুরো পৃথিবী। ওর ছোট্ট হাতটা আমার আঙুল শক্ত করে ধরে আছে—মেহেদীর রংটা এখনো হালকা লেগে আছে ওর নখে।
আমি কিছু জিজ্ঞেস করলাম না। শুধু তাকিয়ে রইলাম ওর চোখের দিকে। সেই চোখের ভেতরে অদ্ভুত এক সরলতা—একটা নির্ভরতা, যেন আমি থাকলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। হঠাৎ মনে হলো, এতদিন আমি কোথায় ছিলাম?
জীবনের ভাঁজে ভাঁজে কত কিছু জমে থাকে—হিসেব, না-পাওয়া, ব্যর্থতার ছোট ছোট খোঁচা। সেসব জমতে জমতে ভেতরে একসময় একটা স্থিরতা এসে যায়—একটা বৃত্তবন্দী মানস সরোবরের মতো, যেখানে জল আছে, কিন্তু কোনো ঢেউ নেই। আমি সেই জায়গাটাতেই আটকে ছিলাম।
কিন্তু আজ, এই ছোট্ট মুহূর্তে, কিছু যেন বদলে যাচ্ছে।
ওর চোখের জল যেন খুব নরম একটা আগুন—যেটা পোড়ায়, কিন্তু ব্যথা দেয় না। সেই আগুনের ভেতর তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে হলো, গত রাতের না-ঘুমানোর হিসেবটা নিঃশব্দে কোথাও মিলিয়ে যাচ্ছে। মাথার ভেতরের অযথা ভারগুলো একটু একটু করে হালকা হচ্ছে। আমি ওকে বুকে টেনে নিলাম। ও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল, তারপর ধীরে ধীরে নিঃশ্বাসটা স্বাভাবিক হয়ে এল। কান্নাটা থেমে গেল, কিন্তু ওর হাতের চাপটা কমল না—সেই চাপের ভেতরেই একটা অদ্ভুত নিশ্চিন্ততা আছে।
আমি জানালার বাইরে তাকালাম। আরও কয়েকটা বাতি জ্বলে উঠেছে ততক্ষণে। হঠাৎ খেয়াল করলাম—আলোগুলো আর একা লাগছে না। বরং মনে হচ্ছে, প্রতিটা আলো যেন কোথাও না কোথাও কারও অপেক্ষা, কারও ফিরে আসা, কারও ছোট্ট পৃথিবীর অংশ।
আমার ভেতরেও কিছু একটা ধীরে ধীরে নড়ছে। অনেকদিন চুপ করে থাকা সেই জায়গাটা আবার নিশ্বাস নিচ্ছে। আমি বুঝতে পারলাম, বাঁচার ইচ্ছেটা কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। সেটা শুধু চাপা পড়ে থাকে—সময়, ক্লান্তি আর অভ্যাসের নিচে। তারপর হঠাৎ, খুব সাধারণ একটা মুহূর্তে, আবার নিজের জায়গা ফিরে নেয়।
আমার মেয়েটা তখন মাথাটা আমার কাঁধে রেখে দিয়েছে। ও হয়তো এখন আর কিছু ভাবছে না। হয়তো ওর ছোট্ট দুঃখটা কেটে গেছে। কিন্তু আমি জানি, এই কয়েকটা মুহূর্ত শুধু ওর না—আমারও।
আমি আলতো করে ওর কপালে চুমু খেলাম।
বাইরে রাত নেমে গেছে পুরোপুরি। তবু অন্ধকারটা আর আগের মতো লাগছে না। ওর চোখের জলে ভেসে থাকা ছোট ছোট স্বপ্নগুলো যেন এখনো কোথাও নড়ছে—নিঃশব্দে, ধীরে। আমি সেগুলো টের পাচ্ছি।
আর মনে হচ্ছে—এই নীরবতার ভেতরেই হয়তো জীবনের আরেকটা নতুন অধ্যায় শুরু হয়ে গেছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।