বিয়ের দিন পাওয়া চিঠি
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ভালোবাসা ও বিচ্ছেদের ছোটগল্প
১৯ অক্টোবর ২০২৬
বিয়ের সাজে বসে নিশি পুরোনো একটা বইয়ের ভেতর চিঠিটা পেল।
চিঠিটা তার ছোট ভাই দিয়েছে। সকালে আলমারি গোছাতে গিয়ে বইয়ের মধ্যে পেয়েছে। খামের ওপর নিশির নাম, নিচে প্রেরকের নাম নেই। তবে খাম খোলার আগেই হাতের লেখাটা চিনে ফেলেছিল সে।
অভিক।
সাত বছর পরেও হাতের লেখা বদলায় না।
নিশি দরজার দিকে তাকাল। বাইরে আত্মীয়দের কথাবার্তা, থালাবাসনের শব্দ, কারও হাসি। ঘরে সে ছাড়া আর কেউ নেই। চিঠিটা খুলে দেখল, ভেতরে ছোট্ট এক টুকরো কাগজ।
‘নিশি, সেদিন তোমার বাবা আমাকে ডেকেছিলেন। আমি তোমাকে কিছু না বলেই চলে গিয়েছিলাম। পারলে মাফ করে দিও।
— অভিক’
নিশি কাগজটা আবার ভাঁজ করল।
সেদিন?
সাত বছর আগের সেই বিকেলটা তার মনে আছে। অভিক বলেছিল, পরদিন তাদের বাড়িতে যাবে। তারপর আর আসেনি। ফোন বন্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতদের কাছে খোঁজ নিয়েও কোনো খবর পায়নি নিশি। প্রথমে রাগ হয়েছিল, পরে অপমান। একসময় সে ধরে নিয়েছিল, অভিক অন্য কাউকে বেছে নিয়েছে।
এখন হাতে মাত্র দুটো লাইন।
নিশি কাগজটা উল্টে দেখল। পেছনে কিছু লেখা নেই।
দরজায় ছোট ভাইয়ের মুখ দেখা গেল। “আপু, সবাই ডাকছে। আর কতক্ষণ?”
নিশি কাগজটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল।
“এটা যে বইতে ছিল, ওখানেই রেখে দে।”
ভাই কাগজটা নিতে গিয়ে থেমে গেল। “চেনো নাকি?”
“চিনি।”
“কে?”
নিশি তার দিকে তাকাল। “তুই যা। আমাকে একটু সময় দে।”
ভাই চলে গেল। দরজা বন্ধ হলো না, শুধু একটু ফাঁক রইল।
নিশি উঠে আয়নার সামনে দাঁড়াল। কপালের টিকলিটা একদিকে সরে গেছে। সে আঙুল দিয়ে ঠিক করল। তারপর আবার বসে পড়ল।
কাগজটা ছোট ভাইয়ের হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু প্রশ্নটা ফিরিয়ে দিতে পারেনি।
বাবা কি সত্যিই অভিককে ডেকেছিলেন?
কেন?
এই সাত বছরে বাবার সঙ্গে কতবার এক টেবিলে খেয়েছে, কতবার তাঁর কাছে টাকা চেয়েছে, কতবার নিজের পছন্দ-অপছন্দ নিয়ে ঝগড়া করেছে। অথচ এই একটা কথা কোনো দিন জিজ্ঞেস করেনি। তখন জানতই না যে জিজ্ঞেস করার মতো কিছু ছিল।
এখন জিজ্ঞেস করলে কী হবে?
বাইরে থেকে মা বললেন, “নিশি, তৈরি হয়েছিস তো?”
“হ্যাঁ, মা।”
মা ঘরে ঢুকে মেয়ের ওড়না ঠিক করে দিলেন। নিশি মায়ের হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। একবার মনে হলো, মাকে জিজ্ঞেস করে। কিন্তু মা ওড়নার ভাঁজ ঠিক করতে করতে বললেন, “গাড়ি চলে এসেছে।”
প্রশ্নটা আবার আটকে গেল।
নিশি জানত, আজ সে বাবাকে জিজ্ঞেস করতে পারে। বিয়ের আগে কয়েক মিনিটের জন্য হলেও। উত্তরটা শুনতে পারে। হয়তো সাত বছরের ভুল বোঝাবুঝি মিটে যাবে, হয়তো নতুন কোনো কষ্টের শুরু হবে।
কিন্তু উত্তর জানার জন্য তার হাতে যে সময়টুকু আছে, সেই সময়ের শেষে তাকে অন্য একটা জীবনে চলে যেতে হবে।
সে বাবাকে না জিজ্ঞেস করার সিদ্ধান্ত নিল না। আবার জিজ্ঞেস করার সাহসও পেল না।
শুধু ব্যাগ থেকে ছোট্ট কাগজটা বের করে মায়ের হাতে দিল।
“এটা আলমারির পুরোনো বইয়ের মধ্যে রেখে দিও।”
মা কাগজটা খুলে দেখলেন না। মেয়ের মুখের দিকে একবার তাকিয়ে ভাঁজ করা কাগজটা নিজের আঁচলে রাখলেন।
তারপর নিশির হাত ধরে বললেন, “চল, মা।”
নিশি উঠে দাঁড়াল।
বাইরে ক্যামেরার আলো জ্বলে উঠেছে। উঠোনে সবাই অপেক্ষা করছে। বাবা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। মেয়েকে দেখে এগিয়ে এলেন, মাথায় হাত রেখে বললেন, “ভালো থাকিস।”
নিশি বাবার হাতটা নিজের মাথা থেকে নামিয়ে দুই হাতে ধরল।
“বাবা, তোমার সঙ্গে একটা কথা ছিল।”
বাবা তাকালেন। “কী কথা?”
নিশি তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। পেছন থেকে কেউ ডাকল, “মামা, তাড়াতাড়ি আসেন। গাড়ি ছাড়বে।”
বাবা মেয়ের হাত চেপে ধরে বললেন, “ফিরে এসে বলিস, মা।”
নিশি মাথা নেড়ে গাড়ির দিকে হাঁটল।
রাতের দিকে নতুন বাড়িতে পৌঁছে ব্যাগ খুলতে গিয়ে সে দেখল, ছোট ভাই ভুল করে পুরোনো বইটা তার ব্যাগে ঢুকিয়ে দিয়েছে। বইয়ের ভেতর সাদা খামটা নেই। শুধু পাতার মাঝখানে ভাঁজের দাগ।
নিশি বইটা বন্ধ করে ব্যাগের তলায় রেখে দিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।