দূরত্বের প্রেম
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। মার্চ ২২, ২০২৬
জুলাই। ঢাকার মোহাম্মদপুর।
বিকেলের কফি শপে হালকা বৃষ্টি শুরু হলো। রিতা জানালার পাশে বসে আছে, চায়ের কাপ হাতে। বাতাসে চুল উড়ছে, চোখে কিছু একটা ভাব—যা বলা যায় না, শুধু দেখা যায়। ফোনের স্ক্রিনে তানভীর। সে অফিসের ছাদে, শহরের ধূসর আলোয়।
"তুই খেয়েছিস?" রিতা জিজ্ঞেস করল, কাপটি টেবিলে রাখতেই।
"হ্যাঁ। আর তুই?"
"এখনো না। ভাবছিলাম, তোর কথা।"
তানভীর কিছুক্ষণ চুপ। তারপর বলল, "আমিও।"
গত সপ্তাহে কোনো কথা হয়নি। রিতার নতুন প্রজেক্ট, তানভীরের অফিসের চাপ—সময় যেন থমকে গিয়েছিল। বৃষ্টি দেখে রিতার মনে পড়ল, দুই বছর আগে ঢাকা স্টেশন। সে ছাতা মিস করেছিল, ভিজে গিয়েছিল। আর তানভীর ছুটে এসেছিল, অপরিচিত এক ছেলে, ছাতা ধরে দিয়েছিল। কিছু বলেনি, শুধু হেসেছিল। সেই হাসি এখনো মনে আছে।
রিতা মেসেজ লিখল, "মনে আছে স্টেশনে?"
তানভীর উত্তর দিল, "হ্যাঁ। তুমি ভিজে গিয়েছিলে, আমি ভয় পেয়েছিলাম।"
"কেন?"
"জানি না। তখনই মনে হয়েছিল, তোমাকে আমাকে দেখতে হবে।"
সেই রাতে মা এলেন রিতার ঘরে। বসলেন বিছানায়। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন।
"তুই কি ওই ছেলেটাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছিস?"
রিতা খাতার পাতা উল্টাচ্ছিল—কবিতা লেখা, কিছু ভালোবাসার, কিছু নিজের একাকীত্বের। সে খাতাটা মায়ের দিকে বাড়াল।
মা পড়লেন। কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, "লেখাগুলো ভালো। কিন্তু তুই কি নিশ্চিত?"
"না," রিতা বলল। "কিন্তু নিশ্চিত না হলেও চেষ্টা করতে চাই।"
মা কিছু বললেন না। শুধু হাত রাখলেন রিতার কাঁধে। তারপর উঠে গেলেন। রিতা বুঝল, এটি সম্মতি নয়, কিন্তু বাধাও নয়।
রিতা খাতার একটি লাইন চোখে রাখল, চুপচাপ:
"দূরে থেকেও মনে লাগে, তুমি কাছে আছ, হাত না ছুঁলেও।"
অফিসে তানভীর। বস ডেকে বললেন, "প্রজেক্ট আবার শুরু করো। যদি পারো না…" কথাটা অসমাপ্ত রেখেই করলেন।
তানভীর ডেস্কে বসে, মনস্তাত্ত্বিক চাপ অনুভব করল। সে কাগজে লেখা চেকলিস্ট দেখে, আবার চেষ্টা করার হিমশিম খুঁজে নিল। ফোনে রিতার মেসেজ এল, "আজ ক্লান্ত লাগছে। তুই?"
"আমিও। কিন্তু ভাবছি, যদি আমাকে অন্য শহরে যেতে হয়?"—সে লিখল।
কিছুক্ষণ নীরবতা। তারপর রিতা লিখল, "তাহলে নতুন শুরু করবি। আমি থাকব।"
তানভীর ফোন রাখল। শহরের আলো দেখল। মনে হলো, একা নই।
আগস্ট। বৃষ্টির মৌসুম শেষ হচ্ছে।
কফি শপে বিকেল। রিতা বসে আছে, হাতে খাতা। তানভীর ঢুকল। ভেজা চুল, একটু ক্লান্ত। সামনে বসল। কিছুক্ষণ চুপ।
"এইগুলো?" সে খাতা নিল।
"হ্যাঁ। আমাদের জন্য।"
তানভীর পড়ল। কবিতা। ভালোবাসার, দূরত্বের, ভয়ের। রিতার একটি লাইন চোখে পড়ল:
"দূরে থাকলেও হাত ছোঁয়া যায়, যদি মন কাছে থাকে।"
"আমি ভয় পাই," রিতা বলল, "যদি একদিন…"
"আমি থাকব," তানভীর বলল। "চাকরি থাক বা না থাক, ঢাকা থাক বা অন্য শহর। যে শহরে যাক, আমি থাকব।"
দুজনেই চুপ। হালকা বাতাস কফি শপে ঘুরছে, চায়ের ধোঁয়া উড়ছে। তানভীরের হাত রিতার হাতের কাছে, ছুঁয়েছে না। দুজনেই জানে, দূরত্ব শুধু শারীরিক। ছোঁয়া আজ দরকার নেই।
রিতা খাতায় চোখ রাখল, তানভীর বাইরে তাকাল। চায়ের ধোঁয়া উড়ছে, বাতাসে চুল উড়ছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।