অচেনা মানুষটা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ২৩ জুন,২০২৬
সাবেরা বেগম কখনো ভাবেননি, যে মেয়েটাকে তিনি এতদিন নিজের মানুষ ভাবতে পারেননি, একদিন সেই মেয়েটার হাত ধরেই তাকে রাত পার করতে হবে।
নীহা এই বাড়িতে আসার পর থেকেই সাবেরা বেগমের মনে একটা অদৃশ্য দূরত্ব ছিল।
মেয়েটা খারাপ ছিল না। এই কথাটা তিনি নিজেও জানতেন।
সমস্যা ছিল অন্য জায়গায়। নীহা তার মনের মতো ছিল না।
তিনি ভেবেছিলেন, ছেলের বউ হবে এমন একজন, যে সকালে তার সঙ্গে রান্নাঘরে থাকবে, সংসারের সব নিয়ম শিখবে, তার অভ্যাসগুলো বুঝে নেবে।
কিন্তু নীহা ছিল আলাদা। সে একটা এনজিওতে চাকরি করত। সকালে বের হওয়ার সময় হাতে সবসময় তাড়া থাকত। ফিরতেও অনেক রাত হয়ে যেত।
সাবেরা বেগমের মনে হতো, মেয়েটা সংসারকে সময় দেয় না। আর নীহার মনে হতো, সে যতটুকু পারছে, চেষ্টা করছে।
কিন্তু এই দুই ভাবনার মাঝখানে যে একটা দূরত্ব তৈরি হচ্ছে, সেটা কেউ মুখে বলেনি।
শুরুটা খুব ছোট ছোট বিষয় থেকে।
নীহা নতুন একটা রান্না করলে সাবেরা বেগম বলতেন, "আমাদের সময়ে এসবের এত ঝামেলা ছিল না।"
নীহা ঘর অন্যভাবে গুছালে বলতেন, "জিনিসপত্র নিজের জায়গায় থাকলে খুঁজতে সুবিধা হয়।"
কথাগুলো শুনতে খুব বড় কিছু ছিল না। কিন্তু প্রতিদিনের ছোট ছোট কথাই একসময় জমে যায়।
নীহা প্রথম দিকে হাসত। পরে শুধু "আচ্ছা" বলে চুপ করে যেত।
কারণ কিছু সম্পর্কের দূরত্ব ঝগড়া করে বাড়ে না। চুপ থাকতে থাকতেও বাড়ে।
রাকিব মাঝে মাঝে মাকে বলত, "মা, নীহা অনেক চেষ্টা করে।"
সাবেরা বেগম তখন বলতেন, "আমি কি বলছি ও খারাপ? শুধু বলছি, ও আমার মতো না।"
এই "আমার মতো না" কথাটাই যেন তাদের মাঝখানে আটকে ছিল।
সেদিন রাতটা অন্যরকম ছিল।
রাকিব অফিসের কাজে ঢাকার বাইরে, গাজীপুরে। বাড়িতে শুধু সাবেরা বেগম আর নীহা।
হঠাৎ রাতের দিকে সাবেরা বেগমের শরীর খারাপ হয়ে গেল। প্রেশারটা মনে হয় বেড়ে গেছে। ঘুম ভেঙে তিনি বুঝলেন, শরীরটা খুব দুর্বল লাগছে।
কাঁপা গলায় শুধু ডাকলেন, "নীহা..."
নীহা পাশের ঘর থেকে দৌড়ে এল। "মা, কী হয়েছে?"
এই প্রথম নয়, কিন্তু সেদিন এই "মা" শব্দটা সাবেরা বেগমের কানে অন্যরকম লাগল।
তিনি কিছু বলতে পারলেন না।
নীহা আর সময় নষ্ট করল না। ডাক্তারের সঙ্গে ফোনে কথা বলল। ওষুধ বের করল। পানি এনে দিল। তারপর রাতভর পাশে বসে রইল।
ভোরের একটু আগে সাবেরা বেগমের ঘুম ভাঙল। জানালার বাইরে তখন আলো ফুটছে।
চোখ খুলে দেখলেন, নীহা পাশের চেয়ারে বসে আছে। ঘুমিয়ে পড়েছে। মাথাটা একদিকে হেলে আছে। এক হাত এখনো তার হাতের ওপর রাখা।
সাবেরা বেগম অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
এই মেয়েটার ওপরই তো কত অভিমান ছিল তার। কতবার মনে হয়েছে, মেয়েটা তাকে বোঝে না।
অথচ আজ রাতে নিজের ছেলে পাশে নেই, এই মেয়েটাই ছিল।
সকালে রাকিব ফিরে এল। মাকে দেখে চিন্তিত হয়ে বলল, "মা, এখন কেমন লাগছে?"
সাবেরা বেগম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর নীহার দিকে তাকিয়ে বললেন, "ও রাতে একবারও ঘুমায়নি।"
রাকিব মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে হালকা হাসল। "আমি জানি মা।"
সাবেরা বেগম ধীরে বললেন, "না। আমি জানতাম না।"
এই কথার পর আর কিছু বলার প্রয়োজন হয়নি।
কয়েকদিন পর বিকেলে নীহা রান্নাঘরে সবজি কাটছিল।
সাবেরা বেগম এসে পাশে দাঁড়ালেন। আগের মতো কোনো মন্তব্য করলেন না। শুধু জিজ্ঞেস করলেন, "এটা কীভাবে করো?"
নীহা অবাক হয়ে তাকাল। "কোনটা?"
সাবেরা বেগম একটু থেমে বললেন, "এই রান্নাটা। আমাকে শেখাবে?"
নীহার মুখে ছোট একটা হাসি ফুটে উঠল। "অবশ্যই।"
সেদিন রান্নাঘরে কোনো জিত-হার ছিল না। ছিল শুধু দুজন মানুষের নতুন করে পরিচিত হওয়া।
কয়েক মাস পর রাকিব একটা দৃশ্য দেখে থেমে গিয়েছিল।
তার মা আর নীহা একই টেবিলে বসে চা খাচ্ছে।
কোনো বড় পরিবর্তন হয়নি। এখনো মাঝে মাঝে মতের অমিল হয়। কখনো নীহার কোনো সিদ্ধান্ত মায়ের পছন্দ হয় না। কখনো সাবেরা বেগমের কোনো কথা নীহার ভালো লাগে না।
কিন্তু এখন তারা কথা বলে। চুপ করে দূরে সরে যায় না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।