শেষ বেঞ্চের মানুষ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
বিশ্লেষণধর্মী । ২৬ মে, ২০২৬
হাসপাতালের করিডোরে একটা অদ্ভুত নীরবতা থাকে। কথা হয়, শব্দ হয়। তবু মনে হয় সবাই নিজের ভেতরে আটকে আছে।
অভিকও সেখানে বসে।
একটা প্লাস্টিকের চেয়ার। নড়লেই কাঁপে। তার বুক এমনভাবে ব্যথা করছে, মনে হচ্ছে ভেতরে কেউ ধীরে ধীরে একটা সুতা টেনে নিচ্ছে।
রিসেপশনের মেয়েটা বলল, “ভিতরে রোগী আছে, অপেক্ষা করুন।”
অভিক মাথা নাড়ল। কথা হয়নি।
চোখ গেল পাশে।
একজন বৃদ্ধ মানুষকে ধরে রেখেছে ছেলে। একজন স্ত্রী স্বামীর রিপোর্ট ভাঁজ করছে খুব যত্ন করে। এক মেয়ে মায়ের কপালে হাত রেখে বসে আছে, যেন হাতটা সরালে সব কিছু ভেঙে পড়বে।
অভিক তাকিয়ে থাকল।
তার স্ত্রী একসময় তার কপালে হাত দিত। জ্বর মাপত। রাত জাগত। এখন জ্বর হলে শুধু বলে, “থার্মোমিটার টেবিলে আছে।”
এই একটা বাক্যই অনেক কিছু বদলে দিয়েছে।
চাকরি গেছে। টাকার হিসাব শেষ। ওষুধের পাতাগুলো টেবিলে জমে থাকে, কেউ গুছায় না।
একদিন স্ত্রী বলেছিল, “সব তুমি করেছ, কিন্তু আমরা কোথায় আছি?”
অভিক উত্তর দেয়নি।
কারণ সে জানত, কিছু কথার উত্তর থাকে না। শুধু নীরবতা থাকে।
সে জীবনে ১৬ বছর ব্যাংকে কাজ করেছে, ১০ বছর প্রাইভেটে। বাবা-মা, ভাইদের দায়িত্ব সব নিজের কাঁধে টেনেছে।
ভাইয়েরা আজ প্রতিষ্টিত তার টাকায়।
আজ তারা ব্যস্ত।
ফোনে বলে, “ভাইয়া, পরে কথা বলি।”
কয়েক মাস আগে বুকের ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছিল। ইনজেকশন লাগবে। টাকা কম ছিল।
সে পাশের একজন অচেনা মানুষকে বলেছিল,
“ভাই, একটু সাহায্য করবেন?”
লোকটা তাকিয়ে ছিল। তারপর চলে গিয়েছিল।
একবার হাসপাতালে ভর্তি নেয়নি। ডিউটি ডাক্তার জিজ্ঞেস করেছিল, “আপনার সঙ্গে কেউ নেই?”
অভিক বলেছিল, “না।”
এরপর আর কথা হয়নি।
আজ ডাক্তার বন্ধু তাকে দেখে থমকে গেল।
“এই অবস্থা?”
অভিক হালকা হাসল, “সময় নেয়।”
ডাক্তার রিপোর্ট দেখল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “কিছু লাগলে জানাস।”
এইটুকুই।
চুপচাপ যত্নের সবচেয়ে সত্য ভাষা।
চেম্বার থেকে বের হয়ে অভিক সিঁড়িতে দাঁড়াল।
দেয়ালের রং খসে পড়ছে। ভেতরে মরচে ধরা লোহা দেখা যাচ্ছে।
অভিক হাত রাখল দেয়ালে। ঠান্ডা।
মানুষও এমন, তার মনে হলো—উপরে রং, ভেতরে ক্ষয়।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বুকটা আবার চেপে ধরল।
শ্বাস ভারী। তবু সে থামল না।
কারণ থেমে গেলে কেউ খেয়াল করে না, শুধু জায়গা বদলায়।
বাইরে সন্ধ্যা নেমেছে। রাস্তা ভরা মানুষ। সবাই বাড়ি ফিরছে।
অভিক হাঁটছে।
হঠাৎ সামনে একটা বেঞ্চ।
একজন তরুণ বসে আছে, মাথা নিচু।
হাতে কোনো ব্যাগ নেই। চোখে ক্লান্তি, যেন অনেকক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে—আর এখন জানে কেউ আসবে না।
অভিক থামল।
তারপর ধীরে গিয়ে পাশে বসল।
কোনো কথা নেই।
শুধু দুইটা শ্বাস।
দুইটা একা মানুষ।
একই বেঞ্চে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।