নীলচে আভা
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ২৭ মে, ২০২৬
রাত প্রায় একটা।
ঘরের বাতি অনেক আগেই নিভে গেছে। শুধু অভিকের মুখে মোবাইলের নীলচে আলো।
সে বিছানায় আধশোয়া হয়ে স্ক্রল করছে—পাহাড়, সমুদ্র, বৃষ্টির শব্দ। সবই আছে, শুধু সে নেই।
পাহাড়, সমুদ্র, বৃষ্টির শব্দ—সবই আছে, শুধু সে নেই।
তার ফেসবুকে অনেক মানুষ। মাঝরাতে স্টোরি দিলে রিঅ্যাকশন আসে দ্রুত। তবু রাত বাড়লে ভেতরে একটা অচেনা ফাঁকা জমে।
নাম দেওয়া যায় না।
সে মোবাইল নামায়। আবার তুলে নেয়।
অভ্যাসগুলো ধীরে ধীরে মানুষকে চালাতে শেখে।
ঘরের সবাই জেগে। বাবা খবর দেখছেন মোবাইলে। ছোট বোন ভিডিও দেখে হাসছে। মা ডাকলেন,
—“চা খাবি?”
অভিক চোখ না তুলে বলল,
—“না।”
মা চলে গেলেন।
একসময় পুরো এলাকা অন্ধকার। বিদ্যুৎ নেই। ওয়াইফাই বন্ধ।
অভিক ফোন নাড়ল। কোনো লাভ নেই।
সে ছাদে উঠল।
আকাশটা বড়। অস্বাভাবিক বড়। দূরে কালো মেঘ। বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। পাশের ছাদে বাচ্চারা দৌড়াচ্ছে—বৃষ্টি নামলে কে আগে ভিজবে, সেই প্রতিযোগিতা।
অভিক রেলিং ধরে দাঁড়াল।
নিচ থেকে দাদির ডাক,
—“নামবি? বৃষ্টি আইবো।”
বারান্দায় হারিকেন জ্বলছে। হলদেটে আলো।
দাদি বললেন,—“আগে বৃষ্টি হইলে তোকে ঘরে রাখা যাইত না।”
অভিক হালকা হাসল। কিছু বলল না।
বৃষ্টি শুরু হলো। টিনের চালে টুপটাপ শব্দ।
দাদি পুরোনো কথা বলছেন—গ্রামের সন্ধ্যা, নদীর পাড়, ঈদের রাত। অভিক শুনছে।
এই গল্পগুলো তার ভেতরে কিছু নাড়া দেয়, কিন্তু সে ব্যাখ্যা করতে পারে না।
একসময় দাদি তার মাথায় হাত রাখলেন।
অভিক থমকে গেল।
এই স্পর্শটা তার অচেনা না—শুধু হারিয়ে ফেলা।
রাতে ঘরে ফিরে সে মোবাইল হাতে নেয়। কিছুক্ষণ স্ক্রল করে। তারপর থেমে যায়।
কোনো কারণ ছাড়াই।
ফোনটা পাশে রেখে জানালা খোলে। বাইরে বৃষ্টি থেমে গেছে। দূরে ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দ।
পরদিন ভোরে ঘুম ভাঙে নীরবতায়।
সে ফোন হাতে নেয়। স্ক্রিন অন হয়। কয়েকটা নোটিফিকেশন।
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ফোনটা উল্টে রাখে।
বাইরে বের হয়।
রাস্তার পাশে কৃষ্ণচূড়া গাছে লাল ফুল। চায়ের দোকানে আড্ডা। কেউ বলে,
—“এই অভিক, চা খাবি?”
সে বসে পড়ে।
চায়ের কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে। কেউ হাসছে, কেউ তর্ক করছে। কারও ফোন বেজে ওঠে, কিন্তু কেউ আর তাড়াহুড়া করে না।
অভিক চুপচাপ দেখে।
মানুষগুলো যেন স্ক্রিনের বাইরে একটু বেশি জীবিত।
সন্ধ্যায় কয়েকজন বন্ধুকে ফোন করে নদীর পাড়ে ডাকে সে।
কেউ ছবি তোলে না। কেউ লাইভে যায় না।
শুধু বসে থাকা, কথা বলা, চুপ থাকা।
সূর্য ডুবে যায় ধীরে। নদীর পানি লালচে।
অভিক তাকিয়ে থাকে। এবার সে ছবি তোলে না।
রাতে বাসায় ফিরে রান্নাঘরের পাশে দাঁড়ায়।
মা জিজ্ঞেস করেন,
—“কিছু বলবি?”
অভিক বলে,—“না… এমনি।”
মা তার মাথায় হাত রাখেন।
অভিক আর কিছু বলে না।
শুধু জানালার বাইরে তাকায়।
বৃষ্টির পরের আকাশে কয়েকটা তারা দেখা যাচ্ছে।
অনেকদিন পর সে খেয়াল করল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।