জেদের আগুনে বাসন্তী
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
লেখার ধরণঃ ছোটগল্প
তারিখঃ ১৭ অক্টোবর ২০২৫
আজকের লেখার কেন্দ্রবিন্দু — বাসন্তী।
একজন নারী, যিনি ভালোবাসা পেয়েও একগুঁয়েমি ও জেদের আগুনে নিজেকে একা করে ফেলেছেন।
তার দাম্পত্য জীবন ভেঙে গেছে, আত্মীয়তার সম্পর্কগুলো মুছে গেছে—আর শেষমেশ নিজের জীবনটাই হয়ে উঠেছে এক দীর্ঘ আফসোসের উপাখ্যান।
বাসন্তী সম্পর্ক গড়তে জানত, কিন্তু সম্পর্ক রক্ষা করতে পারেনি। সে আবেগ হারিয়েছে, হারিয়েছে ভালোবাসার ভাষা।
সংসারে মতের অমিল হলে সে নমনীয় হয়নি, বরং নিজের জিদকে প্রাধান্য দিয়েছে। আর ঠিক সেই জিদই তাকে করেছে পরাজিত— বাহ্যিক নয়, আত্মিকভাবে।
বাসন্তীর জীবন আমি কাছ থেকে দেখেছি। তাই বলছি, জেদের আগুনে যে দগ্ধ হয়, তার পোড়া দাগ থাকে আজীবন।
বাসন্তী সংসারে প্রবেশ করেছিল এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস নিয়ে। সে ভেবেছিল,
“আমি ঠিক থাকলে, সম্পর্কও ঠিক থাকবে।”
কিন্তু বুঝতে পারেনি, সংসার শুধু যুক্তি দিয়ে চলে না—চলে সহনশীলতা, মমতা, ও সংযমে।
বাসন্তী ছোটখাটো দ্বন্দ্বেও স্বামীকে চ্যালেঞ্জ করত,
চেয়েছিল নিজের আমিত্ব প্রমাণ করতে। আর পুরুষ, প্রকৃতিগতভাবে, এমন এক জেদী স্ত্রীর সামনে আরও কঠোর হয়ে ওঠে।
যেখানে নম্রতা জিতে যায়, সেখানে জেদ হেরে যায়—এ সত্য বাসন্তী বুঝে উঠতে পারেনি।
সে ভেবেছিল, দ্বন্দ্বে স্থির থেকে জয়ী হবে, কিন্তু বুঝতে পারেনি, সেই জয়ের বিনিময়ে হারাচ্ছে একজন মানুষ,যে তাকে ভালোবাসত নিঃস্বার্থভাবে।
প্রাচীন পণ্ডিতেরা বলেছেন—নম্র নারী সংসার টিকিয়ে রাখে, আর কঠোর নারী ভাঙনের কারণ হয়।
যে নারী ঝড় উঠলে মাথা নিচু করে নত হতে জানে,
তার পক্ষেই সংসারকে চিরদিন আঁকড়ে রাখা সম্ভব।
কিন্তু বাসন্তী ছিল শুকনো গাছের মতো— ঝড় এলেও মাথা উঁচু করে দাঁড়াত, আর তাই সে ভেঙে পড়েছে, মচকে গেছে, যেখানে ভাঙন আর জোড়া লাগে না।
বাসন্তীর স্বামী একজন ধৈর্যশীল মানুষ ছিল।
সে ভেবেছিল, মেধাবী নারীকে পাশে পেলে সংসার হবে আলোকিত।
তাই অর্থনৈতিক কষ্ট সহ্য করেও বাসন্তীকে এসএসসি থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত পড়িয়েছে।
কিন্তু শিক্ষার আলো বাসন্তীর মধ্যে আনেনি প্রজ্ঞা, আনেছে অহংকার। যতই সে উচ্চশিক্ষিত হয়েছে,
ততই স্বামীকে অবমূল্যায়ন করতে শিখেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের জীবনযাপন দেখে
বাসন্তী নিজের সংসারকে তুচ্ছ মনে করেছে।
সে চেয়েছে দামি পর্দা, ঝকঝকে টাইলস,
দামি সোফা, বড় ফ্ল্যাট— আর প্রতিটি চাহিদার পেছনে দগ্ধ হয়েছে স্বামীর নীরবতা।
বাসন্তীর স্বামী চেয়েছিল শান্তি, আর বাসন্তী চেয়েছিল প্রদর্শন।
একজন চেয়েছিল সম্পর্ককে বাঁচাতে, অন্যজন চেয়েছিল নিজের “আমি”-কে বাঁচাতে।
শেষ পর্যন্ত দুজনই হেরেছে—কিন্তু বাসন্তীর হারটাই ছিল ভয়াবহ।
বাসন্তীর বাবা-মা জানতেন, মেয়ে রাগী, জেদী।
তবু তারা কখনো তাকে শাসন করেননি, সংশোধন করেননি। তারা ভেবেছিলেন—“সময়ই শেখাবে।”
কিন্তু সময় শেখায় কঠিনভাবে—ভাঙনের মধ্য দিয়ে।
লিখতে লিখতে মনে পড়ে গেল বেদুইন এক নারীর উপদেশ—তার কন্যার বিয়ের দিন সে বলেছিল,
“তুমি স্বামীর সামনে নিজেকে দাসী করে দিও;
দেখবে, সে অচিরেই তোমার দাস হয়ে যাবে।”
এই এক লাইনেই লুকিয়ে আছে সংসার টিকিয়ে রাখার মহাত্ম্য। কারণ ভালোবাসা জোরে নয়, বিনয়ে টিকে থাকে।
ভালো পুরুষরা সাধারণত ধৈর্যশীল, কিন্তু জেদী নারীরা তাদের ধৈর্যকে সীমার প্রান্তে ঠেলে দেয়।
আর যখন একদিন সেই সীমা ভেঙে যায়,
তখন সম্পর্কের ছাই ঠান্ডা হয় না কোনোদিনই।
বাসন্তীরও তাই হয়েছে—সে এখন একা,
তবু তার চোখে এখনো সেই জেদের আগুন জ্বলছে—যে আগুনে একদিন সে নিজেই দগ্ধ হয়েছিল।
#জেদেরআগুনে_বাসন্তী #ছোটগল্প
#দাম্পত্যজীবন #enolej_idea #নারীরমন
#জেদওভালোবাসা #বাসন্তীরগল্প #সাহিত্যিকলেখা
#জাহিদলেখা
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।