নীরব ভাঙন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ৩১ মে , ২০২৬
রাত ২:১৭।
অভিকের ঘুম ভেঙে গেল। এটা নতুন কিছু না। গত কয়েক মাসে এমন অনেকবার হয়েছে। তবু প্রতিবারই মনে হয়, হয়তো আজ রাতে আবার ঘুমিয়ে পড়তে পারবে।
সে বিছানায় উঠে বসল। জানালার ফাঁক দিয়ে রাস্তার লাইটের আলো এসে দেয়ালে একটা চৌকো দাগ এঁকে রেখেছে। ঘরের ভেতর সিলিং ফ্যান ঘুরছে ধীর শব্দে।
মোবাইলটা হাতে নিল। হোমস্ক্রিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছবি। পাঁচজন ছেলে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়ে। একজনের হাতে চায়ের কাপ। রায়হানের।
ছবিটা বদলানোর কথা অনেকবার ভেবেছে অভিক। বদলানো হয়নি। রায়হানের নাম্বারটাও এখনও ফোনে আছে। চ্যাটবক্সটাও। শেষ মেসেজটাও।
"ঠিক আছে, তোর যা ইচ্ছা।"
তিন বছর আগে পাঠানো।
মেসের একটা সিট নিয়ে ঝগড়া হয়েছিল। কে আগে ছাড়বে, কে কথা রাখেনি, এসব নিয়ে তর্ক। এখন মনে করলে তুচ্ছ লাগে। সেদিন লাগেনি।
সেদিন দুজনেই ভেবেছিল, অন্যজন আগে ফোন করবে। কেউ করেনি।
অভিক ফোনটা উল্টো করে রাখল। ঘরের ভেতর নিঃশব্দতা জমে আছে। পাশের বাসার ছাদে একটা বিড়াল দৌড়ে গেল। তারপর আবার সব চুপচাপ।
পানি খেতে গিয়ে রান্নাঘরে থামল সে। ডিশ র্যাকে উল্টো করে রাখা একটা স্টিলের বাটি চোখে পড়ল।
বাটিটা চিনতে পারল।
তিন দিন আগে রাতের খাবারের সময় মা ডাল এগিয়ে দিয়েছিল ওই বাটিতে। অভিক তখন ফোনে চোখ রেখেছিল। মা কিছু একটা বলেছিল। সে শুনেনি। "হুম" বলেছিল শুধু।
তারপর কী বলেছিল মা?
মনে নেই।
বাটিটায় হাত ছুঁয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল সে। ফ্রিজ থেকে পানি বের করে খেল। তারপর আবার ঘরে ফিরে এল।
মোবাইলে কয়েকটা নোটিফিকেশন জমে আছে। একজনের নতুন চাকরি হয়েছে। আরেকজন সমুদ্র দেখতে গেছে। কেউ সন্তানের ছবি দিয়েছে। কেউ লিখেছে, "জীবন সুন্দর।"
অভিক কোনোটা খুলল না।
ফোনটা আবার লক করে রাখল।
মাঝে মাঝে তার মনে হয়, খবর আগের চেয়ে অনেক বেশি জানে মানুষ। শুধু মানুষগুলোর খবরই কম জানা হয়।
রাত ২:৪৩।
অভিক আবার ফোনটা হাতে নিল। রায়হানের চ্যাটবক্স খুলল। কীবোর্ড উঠে এলো।
সে কয়েকটা শব্দ লিখল। মুছে দিল।
আবার লিখল। সেটাও মুছে দিল।
শেষ পর্যন্ত শুধু লিখল,
"ঘুমাস নাকি?"
মেসেজটা পাঠিয়ে ফোনটা বুকের ওপর রেখে শুয়ে রইল। দেয়ালের আলোর চৌকো দাগটা একটু সরে গেছে। সম্ভবত বাতাসে রাস্তার লাইটটা দুলছে।
ঘরের কিছুই বদলায়নি।
তবু তার মনে হলো, অনেকদিন বন্ধ থাকা একটা দরজায় সে অন্তত কড়া নেড়েছে।
দশ মিনিট পর ফোনটা কেঁপে উঠল।
রায়হান।
অভিক স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। খুলল না। ফোনটা আবার উল্টো করে রাখল।
কিছুক্ষণ পরে স্ক্রিন অন করল।
"না।"
একটু পর আরেকটা মেসেজ।
"তোর বাসার সামনের চায়ের দোকানটা আছে এখনও?"
অভিকের চোখ চলে গেল জানালার দিকে। দোকানটা দেখা যায় না এখান থেকে। তবু সে জানে, আছে। রাত জেগে থাকা মানুষদের জন্য কিছু দোকান বোধহয় সহজে বন্ধ হয় না।
সে লিখল,
"আছে।"
মেসেজটা পাঠানোর আগেই আরেকটা উত্তর এলো।
"কাল সকালে অফিস আছে?"
অভিক লিখল,
"আছে।"
ওপাশ থেকে উত্তর এলো,
"তাও চল।"
অভিকের ঠোঁটের কোণে একটা হাসি লেগে রইল।
শব্দ হলো না।
ঘরের ভেতর তখনও একই নীরবতা। একই ফ্যান। একই রাত।
শুধু টেবিলের ওপর উল্টো করে রাখা ফোনটা আর নিঃশব্দ ছিল না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।