মোহাম্মাদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ৬ ডিসেম্বর, ২০২৫
সে বসে আছে ফুটপাথের কিনারে। পায়ের কাছে একটা পুরনো কাপড়ের ব্যাগ, যার মুখ খোলা; ভেতরে দুটো জামা, একটা ছেঁড়া নোটবই আর একটা ফাটা কলম। আর কিছু নেই। ব্যাগের মুখ যেমন খোলা, তার চোখও তেমনি খোলা। চোখে আশা আছে, কিন্তু আশাটা এখনো বড় দুর্বল, যেন কোনো শিশু যাকে মা ছেড়ে গেছে রাস্তায়।
মাসের শেষ বিকেল। আকাশটা কমলা-লাল। শহরের লোকেরা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরছে। কারো হাতে বাজারের থলে, কারো হাতে অফিসের ল্যাপটপ ব্যাগ। সবার চোখে একটা তৃপ্তি। আর তার চোখে শুধু একটা প্রশ্ন—আজও কি খালি হাতে ফিরতে হবে?
সে উঠে দাঁড়ায়। পা দুটো কাঁপছে। সারাদিন দশটা জায়গায় গিয়েছিল। কোথাও “ভ্যাকেন্সি নেই”, কোথাও “কাল আসিস”, কোথাও হাসি মুখে বলেছে “আরেকটু এক্সপেরিয়েন্স নিয়ে আসো”। এক জায়গায় গার্ড তাকে ঢোকার আগেই ধমক দিয়েছে, “ওস্তাদ, এখানে চাকরি হয় না, এখানে চাকরি দেওয়া হয়।”
সে আবার বসে পড়ে। ব্যাগটা বুকে জড়িয়ে ধরে। বুকের ভেতরটা একদম খালি। যেন কেউ সব কেড়ে নিয়ে গেছে। মনে পড়ে গ্রামের বাড়ি। মায়ের মুখ। বাবার শেষ কথা— “শহরে গিয়ে মানুষ হবি, বাবা। আমাদের মুখ উজ্জ্বল করবি।” সে এসেছিল মানুষ হতে। কিন্তু শহরটা তাকে মানুষ থেকে একটা নাম্বারে পরিণত করেছে। একটা বেকার নাম্বার।
একটা ছোট্ট মেয়ে তার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। হাতে একটা আইসক্রিম। হঠাৎ থেমে গেল। মেয়েটা তার দিকে তাকাল। তারপর আইসক্রিমটা তার হাতে দিয়ে হাসল। বলল, “খাও।” তারপর মায়ের হাত ধরে চলে গেল।
সে আইসক্রিমটা হাতে নিয়ে বসে রইল। গলছে। হাতে গলে পড়ছে। কিন্তু সে খেল না। চোখ দিয়ে জল পড়ছে। গলা আটকে গেছে। এত ছোট একটা মেয়ে তাকে মানুষ ভেবেছে। আর এই শহরটা তাকে কুকুরও ভাবেনি।
সূর্য ডুবে গেল। রাস্তার লাইট জ্বলে উঠল। সে উঠল। ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল। চোখে এখনো আশা আছে। একটু কম। কিন্তু আছে। পা চলতে শুরু করল। কোথায় যাবে জানে না। কিন্তু থেমে থাকলে তো আরও হারিয়ে যাবে।
একটা ছোট্ট ছেলে এখনো হাঁটছে। শহরের ভিড়ে। একা। কিন্তু হাঁটছে। কারণ হাঁটতে হাঁটতেই একদিন হয়তো কেউ তাকে দেখবে। কেউ তাকে মানুষ বলে ডাকবে।
মাসের শেষ বিকেল। সে আবার একা। কিন্তু এখনো হাঁটছে।
#মাসের_শেষ_বিকেল #একা_ছেলে
#শহরের_ফুটপাথ #আশা_এখনো_আছে
#বেকারত্বের_কষ্ট #মানুষ_হারায়_না
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।