এক প্লেট ভাত
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ১৪ মার্চ ২০২৬
রাতটা খুব নীরব ছিল।
টিনের চালের নিচে ছোট মাটির ঘর। ঘরের ভেতর কেরোসিনের বাতি জ্বলছে—ম্লান হলুদ আলো। বাইরে দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে, মাঝে মাঝে হাওয়ায় টিনের চালটা কেঁপে উঠছে।
মাটির মেঝেতে বসে আছে চারজন মানুষ।
বাবা। মা। আর দুই সন্তান।
তাদের সামনে একটা অ্যালুমিনিয়ামের থালা। থালায় ভাত, সামান্য ডাল, আর একটি শুকনো মরিচ।
বাবা থালাটার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আজ ভাতটা একটু বেশি হয়েছে মনে হয়।”
কথাটা বলেই তিনি হাসলেন।
মা জানেন—এটা সত্যি না।
তবু তিনি চুপ রইলেন। ভাতটা হাত দিয়ে একটু নাড়লেন। তারপর ছেলের থালায় তুলে দিলেন।
“তুই খা।”
ছেলেটা একটু তাকিয়ে বলল,
“তুমি?”
মা হেসে বললেন,
“আমি পরে খাবো।”
ছেলেটা আর কিছু বলল না। খেতে শুরু করল।
বাবা নিজের থালায় সামান্য ভাত নিলেন। তারপর বাকিটা মেয়ের দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
“তুই বড় হচ্ছিস।”
মেয়েটা মাথা নাড়ল।
“আমার লাগবে না।”
কিছু না বলে সে নিজের ভাতের অর্ধেক বাবার থালায় দিয়ে দিল।
বাবা একটু তাকিয়ে রইলেন। তারপর আর কিছু বললেন না।
ঘরের ভেতর আবার নীরব হয়ে গেল।
চামচের শব্দ। থালায় ভাত নাড়ার শব্দ।
বাতিটা মাঝে মাঝে কেঁপে উঠছে।
হঠাৎ বাবা বললেন,
“আজ বাজারে কাজটা পাইনি।”
কথাটা খুব স্বাভাবিকভাবে বলা হলো।
মা ভাত মাখতে মাখতেই বললেন,
“কাল পাবা।”
বাবা কিছু বললেন না।
ছেলেটা খেতে খেতে বলল,
“বাবা।”
“হুম?”
“আমি বড় হয়ে অনেক টাকা কামাবো।”
বাবা একটু হাসলেন।
“কেন?”
ছেলেটা খুব সহজ গলায় বলল,
“তাহলে আমরা সবাই অনেক ভাত খেতে পারবো।”
কথাটা বলেই সে আবার খেতে লাগল।
ঘরের ভেতর কয়েক মুহূর্তের জন্য সব শব্দ থেমে গেল।
মা মুখ ঘুরিয়ে বাতির দিকে তাকালেন।
মেয়েটা নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। তার আঙুল থালার ধারে ধীরে ধীরে ঘুরছে।
বাবা ছেলের মাথায় হাত রাখলেন।
কিছু বললেন না।
খাওয়া শেষ হতে হতে থালাটা প্রায় খালি হয়ে গেল।
শুকনো মরিচটা থালায় পড়ে রইল।
বাবা সেটা ভেঙে চার ভাগ করলেন।
“নাও।”
সবাই একটু করে নিল।
তারপর বাবা উঠে দাঁড়ালেন। বাতিটা একটু উঁচু করে রাখলেন। ঘরের আলোটা সামান্য বেড়ে গেল।
তিনি ধীরে বললেন,
“ঘুমা।”
ছেলেটা ইতিমধ্যে আধা ঘুমে।
মেয়েটা থালা তুলে মায়ের হাতে দিল।
মা উঠলেন।
ঘরের পেছনে একটা ছোট কল আছে। সেখানেই থালা ধোয়া হয়।
বাইরে রাত আরও গভীর হয়েছে।
দূরে ট্রেনের শব্দ শোনা গেল।
মা কলের পাশে বসে থালা ধুচ্ছেন।
থালায় একটু ভাত লেগে আছে।
তিনি আঙুল দিয়ে সেটা তুলে মুখে দিলেন।
তারপর থালাটা আবার ধুয়ে নিলেন।
কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন।
ঘরের ভেতর থেকে বাবার কাশির শব্দ এল।
ছেলেটা ঘুমের মধ্যে অস্পষ্ট গলায় বলল,
“ভাত… আর একটু…”
মা থেমে গেলেন।
তারপর আবার ধীরে থালা ধোয়া শুরু করলেন।
মেয়েটা ভেতর থেকে ডাকল,
“মা?”
“হুম।”
“বাতিটা নিভাবো?”
মা একটু চুপ করে রইলেন।
তারপর বললেন,
“নিভা।”
মেয়েটা বাতিটা নিভিয়ে দিল।
ঘরটা অন্ধকার হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পরে বাবা অন্ধকারে বললেন,
“শোনো।”
মা বললেন,
“কি?”
“কাল আমি অন্য হাটে যাবো।”
মা বললেন,
“হ।”
তারপর আর কোনো কথা হলো না।
বাইরে আবার কুকুর ডাকল।
হাওয়া এসে টিনের চাল ছুঁয়ে গেল।
অন্ধকার ঘরের ভেতর চারজন মানুষ শুয়ে আছে।
একই ছাদের নিচে।
একই রাতের ভেতর।
একই জীবনের মধ্যে।
সকালে উঠলে আবার কাজ খোঁজা হবে।
আবার বাজারে যাওয়া হবে।
আবার সন্ধ্যায় একটা থালায় ভাত উঠবে।
কমও হতে পারে।
আবার একটু বেশিও।
রাত হলে তারা আবার একসাথে বসবে।
একটা থালা সামনে রেখে।
নিঃশব্দে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।