পরে কোনো একদিন
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প
১ নভেম্বর ২০২৬
আলমারির নিচের তাকে পুরোনো খাতাটা খুঁজে পেল রাশেদ। মেয়ের পুরোনো স্কুলের কাগজপত্র সরাতে গিয়ে খাতাটা বেরিয়ে এসেছে। মলাটের এক কোণে ইঁদুরে কেটেছে। ধুলো ঝাড়তেই কয়েকটা পাতা আলগা হয়ে মেঝেতে পড়ল।
খাতার ভেতর থেকে বাসের একটা পুরোনো টিকিটও বের হলো। অর্ধেক ছেঁড়া। গন্তব্য লেখা ছিল, নীলক্ষেত।
রাশেদ টিকিটটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল।
সতেরো বছর আগে এক শুক্রবার সে নীলক্ষেতে গিয়েছিল। একটা বইয়ের দোকানের মালিক দোকান ভাড়া দেবেন বলে কথা দিয়েছিলেন। দোকানটা খুব বড় ছিল না। সামনে সরু একটা জায়গা, পেছনে ছোট ঘর। ভাড়া একটু বেশি, তবু রাশেদের পছন্দ হয়েছিল। জানালার পাশে দুটো চেয়ার রাখার জায়গা ছিল।
সেদিন ফেরার পথে বাসে বসে সে খাতায় দোকানের হিসাব লিখেছিল। কত টাকায় তাক বানানো যাবে, কত টাকার বই কিনতে হবে, দোকানের নাম কী হবে।
নাম ঠিক করেছিল, ‘জানালার পাশে’।
খাতার প্রথম পাতায় এখনো সেই নাম লেখা আছে।
রাশেদ পাতা উল্টাল। কয়েকটা বইয়ের নাম, দোকানের নকশা, মাসিক খরচের হিসাব। এক জায়গায় নিজের হাতের লেখায় লিখেছে, ‘প্রথম মাসে লাভ না হলেও সমস্যা নেই। অন্তত নিজের একটা জায়গা থাকবে।’
লাইনটা পড়ে তার মুখে হাসি এল না।
সেদিনই ছোট ভাই সুমনের ফোন এসেছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে টাকা লাগবে। বাবা মারা যাওয়ার পর সংসারের অনেক কিছু রাশেদের কাঁধে এসে পড়েছিল। মায়ের ওষুধ, ছোট ভাইয়ের পড়াশোনা, বাড়ির খরচ। দোকানের জন্য জমানো টাকাটা সুমনের ভর্তির পেছনে চলে গেল।
টাকা দেওয়ার সময় সে আপত্তি করেনি। সুমনের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাক, সেটা চায়নি। কিন্তু নীলক্ষেত থেকে ফেরার পথে বাসের জানালার পাশে বসে তার খুব রাগ হয়েছিল। কার ওপর, ঠিক বুঝতে পারেনি।
সুমনের ওপর? মায়ের ওপর? নাকি নিজের ওপর?
খাতায় সেদিন সে শুধু লিখেছিল, ‘দোকানটা পরে করব।’
রাশেদ এবার টিকিটটা খাতার ভেতর ঢুকিয়ে দিল।
সুমন এখন ঢাকায় থাকে না। চাকরি ছেড়ে কয়েক বছর আগে নিজের ব্যবসা শুরু করেছে। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ভালোই আছে। মাঝেমধ্যে ফেসবুকে তার ঘোরাঘুরির ছবি আসে। নতুন গাড়ি কিনেছে, গ্রামের বাড়ি মেরামত করেছে। রাশেদ ছবিগুলো দেখে কখনো ভালো বোধ করে, কখনো ফোনটা সরিয়ে রাখে।
একবার সুমন বলেছিল,
‘ভাই, তোমার জন্যই তো পড়াশোনাটা শেষ করতে পেরেছিলাম।’
রাশেদ বলেছিল,
‘হ্যাঁ, মনে আছে।’
সুমন আর কিছু বলেনি।
কিন্তু রাশেদের মনে হয়েছিল, কথাটা বলার সময় সুমনের মুখে যে সহজ হাসি ছিল, সেই হাসির পেছনে তার নিজের অনেকগুলো বছর আটকে আছে। সে কি কখনো ভেবেছে, যে টাকায় তার ভর্তি হয়েছিল, সেই টাকায় একটা দোকান হতে পারত? হয়তো ভেবেছে। হয়তো ভাবেনি।
রাশেদ নিজেও জানে, ভাইয়ের কাছে সেই টাকা ফেরত চাওয়ার কোনো মানে হয় না। তবু মাঝেমধ্যে মনে হয়, সবাই নিজের জীবনটা গুছিয়ে নিল, শুধু সে-ই যেন একটা পুরোনো হিসাবের খাতায় আটকে রইল।
এই ভাবনাটা এলে নিজের ওপরই বিরক্ত হয়। সুমনকে সাহায্য করেছিল বলে কি সারাজীবন তার কাছে কৃতজ্ঞতা দাবি করবে? আবার নিজের স্বপ্নটা হারিয়ে গেছে বলে কষ্ট পাওয়াও কি অপরাধ?
খাতাটা বন্ধ করে সে বিছানায় রাখল।
রান্নাঘর থেকে শারমিনের গলা এল,
‘ওই কাগজগুলো আবার বিছানায় ছড়িয়েছ কেন? মেয়ের বইয়ের সঙ্গে মিশে যাচ্ছিল।’
‘পুরোনো খাতা।’
‘ফেলে দেবে?’
‘দেখি।’
শারমিন আর কথা বাড়াল না। সংসারে এমন অনেক পুরোনো জিনিস আছে, যেগুলো ফেলে দিতে গেলেই কেউ না কেউ বলে, থাক, পরে দেখা যাবে।
রাশেদেরও এই ‘পরে দেখা যাবে’ কথাটার ওপর ভীষণ রাগ। অথচ নিজের জীবনটা সে এই কথার ওপরই রেখে দিয়েছে।
পরদিন অফিস থেকে ফেরার পথে সে নীলক্ষেতের দিকে গেল না। বাসায় ফেরার জন্য যে বাসে ওঠে, সেটাতেই উঠল। কিন্তু বাসটা শাহবাগ পার হওয়ার পর তার মনে হলো, নামতে পারত। একটু ঘুরে পুরোনো দোকানগুলোর দিকে যেতে পারত।
সে নামল না।
বাড়ি ফিরে মেয়ের পড়ার টেবিলে কয়েকটা নতুন বই দেখল। মেয়ে অনলাইনে অর্ডার করেছে। বইয়ের প্যাকেটের গায়ে দোকানের নাম ও ঠিকানা ছাপা। রাশেদ প্যাকেটটা হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখল।
মেয়ে পাশ থেকে বলল,
‘বাবা, বইগুলো ভালো হয়েছে?’
‘দেখি।’
‘তুমি তো আগে অনেক বই পড়তে।’
‘এখন পড়ি না।’
‘কেন?’
‘সময় কোথায়?’
মেয়ে আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। বইগুলো নিয়ে নিজের ঘরে চলে গেল।
রাতে খাওয়ার পর রাশেদ আবার পুরোনো খাতাটা বের করল। শেষের পাতায় অনেক ফাঁকা জায়গা। সেখানে একসময় সে দোকানের হিসাব লিখেছিল। এখন কিছু সংখ্যা কেটে গেছে, কিছু লেখা ঝাপসা।
সে মোবাইল হাতে নিয়ে নীলক্ষেতের কয়েকটি দোকানের ভাড়ার বিজ্ঞাপন খুঁজল। দু-একটা বিজ্ঞাপন খুলল। একটির ভাড়া দেখে আবার বন্ধ করে দিল। আরেকটির ঠিকানা পড়ে রাখল। ফোন নম্বরটায় আঙুল নিয়ে গিয়েও কল করল না।
শারমিন ঘরে এসে বলল,
‘ঘুমাবে না?’
‘একটু পরে।’
‘কাল সকালে উঠতে হবে।’
‘জানি।’
শারমিন বাতি নিভিয়ে চলে গেল।
রাশেদ খাতার পাতায় দোকানের পুরোনো নকশাটা দেখল। তখন সে জানালার পাশে দুটো চেয়ার রাখতে চেয়েছিল। এখন হিসাব করলে হয়তো একটা চেয়ারও রাখা যাবে না। দোকানের ভাড়া, অগ্রিম টাকা, বই কেনা, সব মিলিয়ে কত লাগবে, সে জানে না।
তারপরও খাতাটা ফেলে দিতে পারল না।
টেবিলের ওপর মেয়ের কেনা বইগুলো রাখা। পাশে নিজের পুরোনো খাতা। দুটো জিনিসের মধ্যে কোনো মিল নেই। তবু সে খাতাটা বইগুলোর নিচে চাপা দিল না। আলাদা করে টেবিলের এক কোণে রাখল।
পরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার সময় খাতাটা ব্যাগে নিল রাশেদ।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।