সাত বছর পর
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ০২-০৯-২০২৬
সাত বছর পর নিশিকে দেখে অভিক প্রথমে চিনতেই পারেনি।
স্কুলের ছুটির সময়। গেটের সামনে অভিভাবকদের ভিড়। কেউ বাচ্চার হাত ধরে রাস্তা পার হচ্ছে, কেউ রিকশাওয়ালার সঙ্গে ভাড়া নিয়ে কথা বলছে। অভিক রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। একটা ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনে বেরিয়েছে। হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল গেটের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এক মহিলার ওপর।
নিশি।
চেনার পরও কয়েক সেকেন্ড সে দাঁড়িয়ে রইল। সাত বছর আগে যে মুখটা সে শেষবার দেখেছিল, তার সঙ্গে এই মুখটার মিল আছে। কিন্তু আগের মতো নেই।
নিশি একটা ছেলের ব্যাগ ঠিক করে দিচ্ছিল। ছেলেটা বারবার হাত ছাড়িয়ে সামনে যেতে চাইছিল।
নিশি বলল, “আস্তে যা। গাড়ি আছে।” ছেলেটা বিরক্ত হয়ে উত্তর দিল, “মা, আমি জানি।” নিশি হেসে তার মাথায় হাত রাখল।
অভিক তখনও রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে।
নিশি হঠাৎ মুখ তুলে তাকাল। চোখাচোখি হলো। নিশির মুখের হাসিটা থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড কেউ নড়ল না। তারপর নিশি ছেলেটার হাত ছেড়ে এক পা এগিয়ে এসে বলল, “তুমি এখানে?”
অভিক বলল, “ওষুধ নিতে এসেছিলাম।”
“ও।”
নিশি আর কিছু বলল না।
ছেলেটা মায়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“মা, উনি কে?”
নিশি একটু থেমে বলল, “পরিচিত।”
শব্দটা শুনে অভিক হেসে ফেলল।
নিশি সেটা দেখল।
“কী?”
“কিছু না।”
ছেলেটা তখন জুতার ফিতা নিয়ে ব্যস্ত। নিশি নিচু হয়ে ফিতাটা বাঁধতে লাগল। অভিক দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল। একসময় সে-ও কারও জুতার ফিতা বাঁধতে বসত। মনে পড়তেই তার নিজের পুরোনো কথাটা মনে হলো—“তুমি নিজে পারো না?”
আর নিশি তখন বলত,
“পারি। কিন্তু তুমি করে দিলে ভালো লাগে।”
এই স্মৃতিটা এতদিন পর হঠাৎ কেন মনে পড়ল, অভিক জানে না।
নিশি উঠে দাঁড়াল। বলল,
“কোথায় থাকো এখন?”
অভিক ঠিকানা বলল।
“বিয়ে করেছ?”
প্রশ্নটা শুনে অভিক একটু থামল। “না।”
নিশি মাথা নাড়ল। আর কিছু জিজ্ঞেস করল না।
ছেলেটা মায়ের হাত টেনে বলল, “চলো মা।”
“হ্যাঁ, চল।”
নিশি অভিকের দিকে তাকিয়ে একটু অস্বস্তি নিয়ে বলল, “ভালো থেকো।”
অভিক বলল, “তুমিও।”
নিশি ছেলেটার হাত ধরে হাঁটতে শুরু করল। অভিক সেদিকেই তাকিয়ে রইল। কিছুদূর গিয়ে নিশি একবার পেছনে ফিরল। দুজনের চোখ আবার মিলল। এবার কেউ হাত নাড়ল না।
অভিকও ফিরে দাঁড়াল।
সেদিন রাতে পুরোনো একটা বাক্স গোছাতে গিয়ে সে একটা ছোট্ট কাগজ পেল। কাগজটা হলুদ হয়ে গেছে। ভাঁজ খুলতেই নিজের হাতের লেখা দেখতে পেল। একটা বাজারের তালিকা—চাল, ডাল, ডিম, চা, জুঁই ফুল।
শেষ শব্দটার দিকে তাকিয়ে অভিক অনেকক্ষণ বসে রইল।
জুঁই ফুল নিশির খুব পছন্দ ছিল।
পরদিন সকালে কাগজটা সে ফেলে দিল না। আবার ভাঁজ করে বাক্সের ভেতর রেখে দিল।
দুপুরে ফোনে একটা অচেনা নম্বর থেকে কল এল। ধরবে কি না, ভেবে কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকল অভিক। তারপর ফোনটা বেজে বেজে থেমে গেল। একটু পর আবার বেজে উঠল।
এবার সে ধরল।
ওপাশ থেকে নিশির গলা,
“অভিক?”
অভিক কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“হ্যাঁ।”
“কাল তোমার সঙ্গে ঠিকমতো কথা বলা হলো না।”
“হুম।”
“তোমার কি খুব তাড়া ছিল?”
“না।”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।
তারপর নিশি বলল,
“ছেলেটা তোমার কথা জিজ্ঞেস করছিল।”
অভিক জানালার বাইরে তাকাল।
“কী বলেছ?”
“বলেছি, তুমি আমার পুরোনো পরিচিত।”
অভিক মৃদু হেসে বলল,
“ঠিকই বলেছ।”
নিশিও একটু হাসল। তারপর বলল,
“আচ্ছা, রাখি।”
“হুম।”
ফোন কেটে গেল। অভিক ফোনটা টেবিলে রেখে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।