পথের ওপারের মানুষ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ২৩ জুন,২০২৬
কলেজ থেকে ফেরার পথে রাহাত মোড়ের ফুচকার দোকানটায় দাঁড়ায়। প্রায় রোজই।
দাঁড়ালে রাস্তাটা পুরো চোখে পড়ে। রিকশার বেল, স্কুল ছুটির ভিড়, বাজারের নাইলনের ব্যাগ হাতে হন্তদন্ত লোকজন। আর ওপাশে কয়েকটা ছেলে। তারা থাকে। প্রতিদিন, একই রেলিংটায় হেলান দিয়ে।
সেদিনও ছিল।
রাহাত তখন দোকানের পাশে দাঁড়িয়ে একটা ঠান্ডা পানির বোতল খুলছিল। বোতলের গায়ে ঘাম জমে আছে।
তখনই রিমি আপুকে দেখল। রাস্তার ওপারে। কলেজ থেকে ফিরছে, কাঁধে ব্যাগ, হাতে সেই চেনা নীল রঙের ফাইলটা, কোণাটা একটু ছেঁড়া।
ছেলেগুলোর একজন রিমির দিকে তাকিয়ে কিছু একটা বলল। নিচু গলায়। বাকিরা হেসে উঠল।
কথাটা রাহাত শুনতে পায়নি। শুনেছে শুধু হাসিটা। আর দেখেছে রিমির মুখটা।
মেয়েটা কিছু বলেনি। শুধু হাঁটার গতি একটু বাড়িয়ে দিল। ব্যাস।
পুরো ঘটনাটা দুই মিনিটও হয়নি, হয়তো আরও কম। কিন্তু বাসায় ফিরেও রাহাত মাথা থেকে সেটা নামাতে পারল না।
রাতে খেতে বসে সে টের পেল, রিমি আজ অস্বাভাবিক চুপ। মা দু-একবার জিজ্ঞেস করলেন, ভাত নিবি? রিমি শুধু "হুম" বলল।
খাওয়া শেষে রাহাত ওর ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।
"আপু।"
"কী?"
"আজ কিছু হয়েছে?"
রিমি বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছিল। চোখ তুলল না।
"না।"
"সত্যি বল।"
এবার সে বিরক্ত হয়ে তাকাল।
"তোর এত জানতে হবে কেন?"
রাহাত থমকে গেল।
"এমনিই।"
"এমনিই কিছু না। পড়তে যা।"
রিমি আবার বইয়ে মুখ গুঁজল। কিন্তু গলায় যে রাগটা ছিল, সেটা রাগ মনে হলো না রাহাতের। অন্য কিছু মনে হলো।
পরদিন বিকেলে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা চলছিল। পাশ দিয়ে একটা মেয়ে হেঁটে গেল, সালোয়ার কামিজ পরা, কানে ইয়ারফোন।
রাহাতের এক বন্ধু হেসে একটা মন্তব্য ছুড়ে দিল। বাকিরা হেসে উঠল।
আগে হলে রাহাতও হয়তো হাসত। সেদিন পারল না।
হঠাৎ নীল ফাইল হাতে রাস্তা পার হওয়া রিমির মুখটা ভেসে উঠল।
সে বলে ফেলল, "এইসব বলে কী মজা পাস?"
বন্ধুরা প্রথমে ভেবেছিল মজা করছে। একজন বলল, "কী রে, আজ এত ভদ্র?" আরেকজন বলল, "জ্ঞান দিস না তো।"
রাহাত আর কথা বাড়াল না। আড্ডাটা কেমন পানসে লাগল।
এরপর সব আগের মতোই চলল, মোটামুটি। মোড়ে আড্ডা হলো, হাসাহাসি হলো, মাঝে মন্তব্যও হলো। পৃথিবী রাতারাতি বদলে যায়নি।
শুধু রাহাত টের পেল, সে আর আগের মতো হেসে উঠতে পারছে না। একসময় নিজেই একটু সরে আসতে শুরু করল।
বন্ধুরা খোঁচা দিল। "কী রে, প্রেমে পড়েছিস?" সে হেসে উড়িয়ে দিল।
এক বিকেলে আবার সেই মোড়ে দাঁড়িয়ে ছিল রাহাত। ফুচকার টক পানির ঝাঁজালো গন্ধ আসছে। আকাশে জুনের ভ্যাপসা মেঘ, বৃষ্টি নামবে নামবে করছে।
তখনই রিমিকে দেখল। আজ হাতে নীল ফাইলটা নেই।
ছেলেগুলোর একজন মুখ খুলতে যাচ্ছিল। পাশের ছেলেটা তাকে থামিয়ে দিল। "থাক না। ওসব বলার দরকার কী?"
খুব সাধারণ একটা কথা। অন্য দিন হলে কেউ খেয়ালই করত না, সম্ভবত।
রাহাত করল। রিমিও করল।
রাস্তা পার হওয়ার সময় রিমি এক সেকেন্ডের জন্য থামল। মাথা ঘুরিয়ে ছেলেটার দিকে তাকাল। কিছু বলল না।
তারপর আবার হাঁটা শুরু করল। রাহাত দেখল, হাঁটতে হাঁটতে রিমির মুখের কোণে খুব আলতো একটা হাসি ফুটে উঠেছে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।