আমার মতো যারা জটিল হার্টের রোগে ভুগছেন, তারা যখন ডাক্তার দেখাতে যান, ডাক্তাররা এক জিনিস অতি জোরে বলেন,
“সবসময় চিন্তামুক্ত থাকবেন।”
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, মাথায় একগাদা চিন্তা নিয়ে ডাক্তারকে কীভাবে বোঝাবো, আমরা তো এখানে চিন্তা নিয়ে এসেছি!
ডাক্তারের চেম্বারে প্রবেশের আগে আমার রক্তচাপ এক রকম, আর ডাক্তারকে দেখার চিন্তায় প্রবেশের পরে সেটা আরেক রকম। ডাক্তার হয়তো তা বোঝেননি। তার চেম্বারের মৃদু আলো আর টেবিলে রাখা কাগজে আমার মন ভাসছে,চিন্তার সমুদ্রের মধ্যে।
চিন্তা শুরু হলো, “ডাক্তার কি আমাকে আর কী কী টেস্ট দেবেন?”
সেই চিন্তায় শ্বাসকষ্টের সূচনা টের পেলাম। তবে ভাগ্য ভালো, টেস্ট বেশ সীমিত হলো। তারপরও, প্রেসক্রিপশনের জন্য ডাক্তার কলম ধরার মুহূর্তে আমি যেন এক চাতক পাখির মতো তাকিয়ে রইলাম—তিনি কী লিখছেন, কী লিখছেন…?
গত রাতের ইন্টারনেটে পড়াশোনার কিছু স্মৃতি কাজে লাগিয়ে কিছু দামি ঔষধ বাদ দিতে বললাম ডাক্তারকে, যে ঔষধগুলো সত্যিই অতিরিক্ত। প্রেসক্রিপশন শেষ হলে মনে হলো, বুকে জমাট বাঁধা রক্তের পিণ্ডটা যেন হঠাৎ সরে গেলো।
চেম্বার থেকে বের হয়ে দু’পায়ের উপর ভর দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। এরপর মাথায় এলো, ঔষধের দাম কত হবে?
শীতের মিষ্টি রোদে কপালে বিন্দুবিন্দু ঘাম জমতে শুরু করল। ঔষধের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দাম শুনে, চোখের সামনে একটি দৃশ্য ফুটে উঠলো,
“এই টাকা দিয়ে সংসারের কত কিছু হতো!”
হঠাৎ সেই দৃশ্য বদলে গেল, যখন দোকানের ভদ্রলোক ঔষধ আর বিল হাতে দিলেন।
চিন্তার নতুন পালা, “যদি ঔষধগুলো না কিনতাম কী হতো?”
নানা ভাবনা নিয়ে বাসায় ফিরলাম।
বাসার সবাই যেন বলছে,
“কিছু হয়নি, তুমি অযথা ডাক্তার দেখাতে গিয়েছ।”
তাদের সেই কথা শুনে, আমার মনের মধ্যে চিন্তার গাছের শিকড় আরও মজবুত হলো।
রাত এলো, আর চিন্তা বহন করে গেলো আমার সাথে। কষ্টে কেনা ঔষধগুলো খাবার পর মনে হলো, ঔষধগুলো যেন আমার সঙ্গে বিদ্রুপ করছে। গভীর রাতের নিস্তব্ধতায় চিন্তার গাছ বেড়ে চলল, মনের গভীরে শিকড় গেড়ে বসল।
ভোরের আলো আসতেই আবারও চিন্তার ফাঁদে পড়ি। নামাজের আগে কানে আসে আযানের সুর। নামাজে দাঁড়িয়ে ভাবি—“সৃষ্টিকর্তার কাছে কি চাইবো?” নামাজ শেষে মোনাজাতে বসে মনে হয়, চাইতে চাইতে যেন কিছুই চাইতে চাই না।
ঔষধগুলো কাজ করছে, শরীর হালকা হতে লাগল। মনে হলো, আমি বালুকণার একটি ভাস্কর্য হয়ে আছি সমুদ্রপারে, আর ঢেউ আস্তে আস্তে আমার শরীর ক্ষয় করছে। হারিয়ে যাচ্ছি অচেনা এক দিশায়। এভাবেই শেষ হলো একটি দিনের চিন্তা ও রাতের নিস্তব্ধতা।
ঘুম ভাঙার সাথে সাথে আবার শুরু হবে জীবনের আরেকটি চিন্তা।
আপনার কি মনে হয়—চিন্তামুক্ত জীবন সম্ভব?
ডাক্তারের কি উচিত নয় রোগীর চিন্তাযুক্ত জীবনের কথা মাথায় রেখে চিকিৎসা করা?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।