পরাজয়
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ৪ জুলাই, ২০২৬
"জীবনের পরাজয়, সেটা নির্ধারিত ছিল। শুধু জীবনের মাঝ দিয়ে বয়ে গেল কিছুটা সময়।"
সেদিন হাসপাতালে যাওয়ার আগে অভিক ড্রয়ারের ভেতর অনেকক্ষণ কী যেন খুঁজছিল।
নিশি রান্নাঘর থেকে বলল,
কী খুঁজছ?
নীল কলমটা।
নতুন একটা তো আছে।
না, ওই পুরোনোটা।
নিশি আর কিছু বলল না। জানত, অভিকের এই অভ্যাসটা বদলাবে না। একটা কলম, একটা মগ, একটা শার্ট—যেটার সঙ্গে মায়া পড়ে যায়, সেটা সহজে ছাড়তে পারে না সে।
ডাক্তার যা বললেন, দুজনেই শুনল।
কেউ কোনো প্রশ্ন করল না।
ফেরার পথে রিকশাতেও তেমন কথা হলো না।
বাড়ি ফিরে অভিক জুতা খুলে বারান্দায় গিয়ে বসে রইল।
নিশি চা বানিয়ে এনে পাশে রাখল।
চা ঠান্ডা হয়ে গেল।
কেউ কাপটা হাতে নিল না।
রাতে শুতে যাওয়ার আগে নিশি আস্তে করে জিজ্ঞেস করল,
খুব ভয় লাগছে?
অভিক একটু ভেবে বলল,
ভয় না... মনে হচ্ছে, অনেক কাজ বাকি রেখে ফেলেছি।
সব কাজ কি শেষ করা যায়?
অভিক উত্তর দিল না।
তাদের বিয়ে হয়েছিল অনেক বছর আগে।
শুরুতে ছোট্ট একটা ভাড়া বাসা ছিল। টিনের আলমারি, লোহার খাট, আর হিসেব করে চলা সংসার।
অভাব ছিল।
তবু সন্ধ্যা হলে দুজনে ছাদে উঠে বসত।
এক কাপ চা ভাগাভাগি করে খেত।
অভিকের একটা অদ্ভুত শখ ছিল।
যেখানেই যেত, একটা করে বুকমার্ক কিনে আনত।
নিশি একদিন হেসে বলেছিল,
এত বুকমার্ক দিয়ে কী করবে?
অভিক বলেছিল,
একদিন বড় একটা বুকশেলফ বানাব। তখন সব লাগবে।
বুকশেলফ আর বানানো হয়নি।
বুকমার্কগুলো টিনের একটা ছোট বাক্সেই জমতে থাকল।
তারপর শুরু হলো হাসপাতাল, রিপোর্ট, ওষুধ, অপেক্ষা।
দিনগুলো আলাদা করে মনে থাকত না।
শুধু তারিখ বদলাত।
টাকা ফুরিয়ে আসছিল।
একদিন নিশি আলমারি খুলে বিয়ের চুড়িগুলো বের করল।
খুলতে গিয়ে একটা আটকে গেল।
অনেক বছর পরে খুলছিল।
অভিক বিছানায় বসে দেখছিল।
হঠাৎ উঠে অন্য ঘরে চলে গেল।
নিশি ডাকেনি।
চুড়ি বিক্রি করে ফিরে এসে দেখে, অভিক বারান্দায় দাঁড়িয়ে।
পেছন ফিরে শুধু বলল,
খুব কম দাম দিল?
নিশি হেসে বলল,
দাম নিয়ে এত ভাবছ কেন?
অভিক আর কিছু বলল না।
আসলে দাম নিয়ে ভাবছিল না।
ভাবছিল, একটা মানুষকে বাঁচাতে আর কত স্মৃতি বিক্রি করতে হবে।
কয়েক মাস পরে গ্রামের ছোট্ট জমিটাও বিক্রি করতে হলো।
দলিলে সই করার সময় কলমটা বারবার কাঁপছিল।
লোকটা বিরক্ত হয়ে তাকিয়েছিল।
অভিক শুধু বলেছিল,
হাতটা আর আগের মতো চলে না।
সেদিন বাড়ি ফিরে ও আর কোনো কথা বলেনি।
রাতে নিশি দেখল, অভিক টিনের বাক্সটা খুলে বুকমার্কগুলো দেখছে।
কী দেখছ?
কিছু না।
আবার কিছু না?
অভিক একটু হেসে বলল,
ভাবছিলাম... এত বুকমার্ক জমালাম, শেষ পর্যন্ত কোনো বই-ই শেষ করা হলো না।
নিশি সঙ্গে সঙ্গে বলল,
বাজে কথা বলবে না।
অভিক মাথা নাড়ল।
আচ্ছা।
তারপর সত্যিই আর কিছু বলেনি।
সেই রাতের পর থেকে ওর কথা আরও কমে গেল।
আগে সকালে খবরের কাগজ পড়ত।
এখন খুলেই রেখে দিত।
আগে বাজারে গেলে নিশির জন্য অকারণে কিছু নিয়ে আসত।
এখন বাজারে যাওয়াটাই বন্ধ হয়ে গেছে।
এক ভোরে নিশির ঘুম ভাঙল।
পাশের জায়গাটা খালি।
দরজাও আধখোলা।
বারান্দায় গিয়ে দেখল, অভিক চেয়ারে বসে আছে।
মাথাটা সামান্য কাত হয়ে আছে।
হাতের মুঠোয় সেই পুরোনো নীল কলম।
নিশি ডাকল,
অভিক...
কোনো উত্তর এল না।
আরও কাছে গিয়ে ওর হাত থেকে আস্তে করে কলমটা খুলে নিল।
ঢাকনাটা খোলা ছিল।
কালি শুকিয়ে গেছে।
অনেক দিন পরে এক বিকেলে নিশি আলমারি গোছাতে গিয়ে টিনের বাক্সটা বের করল।
এক এক করে বুকমার্কগুলো হাতে নিল।
কোনোটায় লেখা—কক্সবাজার।
কোনোটায়—রাজশাহী।
একটায় কিছুই লেখা নেই।
শুধু সমুদ্রের ছবি।
অভিক কোনোদিন সমুদ্র দেখেনি।
সবশেষে একেবারে নিচে একটা ভাঁজ করা কাগজ পেল।
সেখানে অভিকের হাতের লেখা—
"জীবনের পরাজয়, সেটা নির্ধারিত ছিল। শুধু জীবনের মাঝ দিয়ে বয়ে গেল কিছুটা সময়।"
নিশি কাগজটা আবার ভাঁজ করে আগের জায়গাতেই রেখে দিল।
টিনের বাক্সটার ঢাকনা বন্ধ করল।
পরদিন সকালে ঘর ঝাড়ু দিতে গিয়ে বাক্সটার গায়ের ধুলোও মুছে দিল।
আর কিছু করল না।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।