আমি কারও দরকারি নই
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ১৯ আগস্ট ২০২৬
অফিসে নতুন ছেলেটা এসে বলেছিল,
স্যার, এই রিপোর্টটা আমি করে দিচ্ছি। আপনি আর কষ্ট করবেন না।
কথাটা খুব স্বাভাবিক ছিল।
অভিকও হেসে বলেছিল,
ঠিক আছে, করো।
নিজের ডেস্কে ফিরে এসে কিছুক্ষণ কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে ছিল সে।
এই কাজটা তো সে এত বছর ধরে করে এসেছে।
এখন আর তাকে লাগছে না?
কথাটা মাথা থেকে সরাতে পারছিল না।
মেঘলা বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠেছে। নিজের ক্লাস, পরীক্ষা, বন্ধু, ভবিষ্যৎ—সব নিয়ে ব্যস্ত। মিশিরও একই অবস্থা।
আগে সন্ধ্যা হলেই দুজনের একজন এসে বলত,
বাবা, এটা কীভাবে করব?
অথবা,
বাবা, কাল আমাকে নিয়ে যাবে?
এখন দরকার হলে ফোন আসে।
বাবা, বিকাশে একটু টাকা পাঠাবে?
বাবা, এই ফর্মটা একবার দেখবে?
তারপর ফোন কেটে যায়।
অভিক কখনো মেয়েদের ওপর রাগ করেনি। বরং ফোন কেটে যাওয়ার পরও কিছুক্ষণ ফোনটা হাতে নিয়ে বসে থাকত।
নিশি একদিন রান্নাঘর থেকে বলেছিল,
কার ফোন ছিল?
মেঘলার।
কী বলল?
কিছু না। টাকা লাগবে।
নিশি হেসে বলেছিল,
মেয়েরা বড় হয়ে গেছে।
অভিকও হেসেছিল।
কিন্তু কথাটা তার ভেতরে কোথাও গিয়ে আটকে ছিল।
বাড়ির অনেক সিদ্ধান্তও এখন আর অভিককে ঘিরে হয় না।
মেঘলা কোথায় পড়বে, মিশি কোন কোর্স করবে, ঘরের পর্দা বদলাবে কি না—মেয়েরা আর নিশি নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নেয়।
অভিক মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে,
তোমরা কী ঠিক করলে?
মেঘলা বলে,
হয়ে গেছে বাবা।
এই “হয়ে গেছে” কথাটা শুনতে শুনতে অভিক একসময় সিদ্ধান্ত নেওয়া বন্ধ করে দিল।
কেউ জিজ্ঞেস না করলে মতামত দিত না।
নিশি একদিন বলল,
মেঘলার জন্য একটা নতুন ল্যাপটপ লাগবে। পুরোনোটার অবস্থা ভালো না।
অভিক হিসাব করতে বসেছিল।
কত?
মেঘলা দেখেছে। ভালো একটা নিতে হবে।
অভিক বলল,
আমি কাল দোকানে
মেঘলা তখন পাশের ঘর থেকে বলল,
না বাবা, তুমি যেও না। আমি আর মা দেখে নেব।
অভিক থেমে গেল।
আচ্ছা।
তারপর আর কিছু বলল না।
কয়েক দিন পর অফিসে নতুন সফটওয়্যার নিয়ে একটা প্রশিক্ষণ হলো।
অভিক মন দিয়ে শিখতে চেয়েছিল।
পাশে বসা নতুন ছেলেটা হেসে বলল,
স্যার, আপনি থাক, আমি করে দিচ্ছি।
অভিক বলল,
আমি পারব।
ছেলেটা একটু অপ্রস্তুত হয়ে সরে গেল।
অভিক স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
কাজটা সে পারল।
কিন্তু শেষ করার পরও তার ভালো লাগল না।
আগে একটা কাজ ঠিকমতো শেষ হলে তার ভেতর একটা তৃপ্তি আসত।
সেদিন শুধু মনে হলো—আর কতদিন?
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে দেখল, মেঘলা আর মিশি বসার ঘরে বসে কথা বলছে। নিশিও আছে।
মেঘলা বলল,
মা, তাহলে ঠিক হলো। আগামী মাসে আমরা বাসাটা বদলাব।
অভিক দরজার কাছে দাঁড়িয়ে শুনছিল।
বাসা বদলাবে?
মেঘলা তাকিয়ে বলল,
হ্যাঁ বাবা। ইউনিভার্সিটি থেকে অনেক দূর হয়ে যাচ্ছে। মিশিরও যাতায়াতে সমস্যা।
অভিক বলল,
কোথায় নেবে?
মেঘলা জায়গার নাম বলল।
অভিক হিসাব করতে শুরু করল।
ভাড়া বেশি। যাতায়াতের খরচও বাড়বে।
সে বলতে যাচ্ছিল, “এটা কি দরকার?”
কিন্তু থেমে গেল।
তোমরা যেটা ভালো মনে করো, করো।
মেঘলা অবাক হয়ে তাকাল।
তুমি কিছু বলবে না?
অভিক হেসে বলল,
তোমরা তো ঠিক করেই ফেলেছ।
সে নিজের ঘরে চলে গেল।
দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসে রইল।
কিছুক্ষণ পর নিশি এসে দরজায় দাঁড়াল।
মন খারাপ?
না।
তুমি সারাদিন “না” বলছ কেন?
অভিক হেসে বলল,
কী বলব?
নিশি ঘরে ঢুকে তার পাশে বসল।
যা মনে হচ্ছে, সেটা।
অভিক অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
আমার মনে হয়, এখন আর আমাকে কারও দরকার নেই।
নিশি তার দিকে তাকিয়ে রইল।
এই কথাটা কেন মনে হলো?
জানি না। আগে কোনো কিছু হলে আমাকে ডাকত। এখন তোরা সব ঠিক করে ফেলিস। অফিসেও নতুন ছেলেরা সব করে ফেলে।
নিশি একটু চুপ করে বলল,
তুমি কি চাও, আমরা সব কাজে তোমাকে ডাকব?
অভিক মাথা নাড়ল।
না।
তাহলে?
অভিক জানালার বাইরে তাকাল।
শুধু... মাঝে মাঝে যেন মনে হয়, আমি আছি।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে কথাগুলো শুনছিল মেঘলা।
সে ভেতরে ঢুকল না।
সেদিন রাতে নিজের ঘরে গিয়ে পুরোনো ছবিগুলো খুলে বসেছিল।
একটা ছবিতে সে খুব ছোট। বাবার কাঁধে বসে আছে।
আরেকটায় মিশির হাত ধরে অভিক দাঁড়িয়ে।
মেঘলা ছবিগুলো দেখতে দেখতে বুঝল—বাবা শুধু সংসারের খরচ চালাননি। তাদের প্রতিদিনের ছোট ছোট প্রয়োজনের ভেতর নিজের জায়গাটাও বানিয়ে নিয়েছিলেন।
এখন মেয়েরা বড় হয়েছে।
কিন্তু বাবাটা হয়তো এখনও সেই পুরোনো জায়গাটাতেই দাঁড়িয়ে আছে।
পরদিন সকালে মেঘলা বাবার ঘরে গিয়ে বলল,
বাবা?
অভিক ঘড়ি পরছিল।
হুম?
আজ আমাদের সঙ্গে বাজারে যাবে?
অভিক তাকাল।
কেন?
মিশির জন্য কিছু কিনতে হবে। আর আমার ল্যাপটপটাও তোমার সঙ্গে দেখে নিতে চাই।
অভিক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল।
তোমরা তো নিজেরাই দেখে নিতে পারো।
মেঘলা হেসে বলল,
পারি। কিন্তু তোমাকে নিয়েই যেতে চাই।
অভিকের মুখে ছোট্ট একটা হাসি ফুটল।
কখন বেরোব?
তুমি যখন বলবে।
মেঘলা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
অভিক কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে জুতোর ফিতা বাঁধতে বসে গেল।
বাইরে মেঘলা মিশিকে বলছিল,
বাবাকে ডাকিস না। উনি তৈরি হচ্ছেন।
মিশি বলল,
বাবা কি আবার দেরি করবে?
অভিক ঘরের ভেতর থেকেই বলল,
এই তো, আসছি।
তার গলায় বহুদিন পর সেই পুরোনো স্বরটা ফিরে এসেছিল।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।