জানালার ওপাশে একটু আলো
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প । ২৮ মে, ২০২৬
বিকেল নামার আগেই ঘরটা অন্ধকার হয়ে যায়।
আগে অভিক জানালাটা খোলা রাখত। এখন বেশিরভাগ দিন বন্ধই থাকে। বাইরের শব্দ তার সহ্য হয় না। পাশের বাসার বাচ্চারা খেলতে খেলতে চিৎকার করলে, রিকশার বেল একটার পর একটা বাজলে, কিংবা নিচের দোকানে হঠাৎ হাসির শব্দ উঠলে তার মনে হয়—পৃথিবীর মানুষজন বোধহয় এখনও বেঁচে থাকার ভেতর কিছু খুঁজে পায়। শুধু সে পারে না।
শুধু সে পারে না।
ঘড়িতে দুপুর দুইটা। তবু সে বিছানা ছাড়েনি।
বালিশের পাশে ফোনটা উল্টো করে রাখা। স্ক্রিনে আলো জ্বলে আবার নিভে যায়। একটা মেসেজ এসে ছিল সকালে—“ভাই, বেঁচে আছেন নাকি?” অভিক নোটিফিকেশনটা দেখেছিল, কিন্তু উত্তর দেয়নি।
তার মা দরজার বাইরে এসে দাঁড়ান—“খাবি?”
অভিক বলে—“পরে।”
পরে। দুপুরে। রাতে। কখনও ভোরের দিকে।
অভিক একসময় খুব কথা বলত। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে মাইক হাতে কবিতা পড়ত, বন্ধুদের নিয়ে রাত জেগে চা খেতে যেত, নদীর পাড়ে বসে হুটহাট গান ধরত। তখন তার হাসি ঘর ভরিয়ে দিত। এখন আয়নার সামনে দাঁড়ালেও চোখ সরিয়ে নেয় দ্রুত।
একদিন আলমারি ঘাঁটতে গিয়ে পুরোনো আইডি কার্ডটা হাতে আসে। ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। কাঁধে ব্যাগ, চোখে অচেনা একটা জেদ—যেন অন্য কেউ। তারপর ড্রয়ারটা বন্ধ হয়ে যায়।
সেদিন রাতে মা জিজ্ঞেস করেছিলেন—“তুই কি কোনো কষ্টে আছিস?”
অভিক হালকা হাসে—“না তো।” তারপর আর কিছু না।
রাতে ঘুম আসে না। ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভোরের আজান শোনা যায়। কখনও বুক ধড়ফড় করে, কখনও সবকিছু একেবারে নিঃশব্দ হয়ে যায়।
একসময় সে লিখত। ছোট ছোট গল্প, মাঝরাতের চিন্তা, ভেতরের ভয়। মানুষ পড়ত, শেয়ার করত, প্রশংসা করত। কয়েক মাস আগে সে লিখেছিল—“কিছুদিন ধরে খুব খারাপ লাগছে।” নিচে কমেন্ট—“এত চিন্তা কেন?”, “বাইরে যান”, “সব মাথার ভেতর।” একজন শুধু হা-হা রিয়্যাক্ট দিয়েছিল। তারপর লেখা থেমে যায়।
তারপর খোঁজ নেওয়াও ধীরে ধীরে কমে যায়। আগে ফোন, তারপর মেসেজ, তারপর শুধু নামটা।
একদিন বিকেলে অনেকদিন পর অভিক বাইরে বের হয়। আকাশ মেঘলা। রাস্তার পাশে জমে থাকা পানিতে নীয়ন আলো কাঁপছে। মোড়ের চায়ের দোকানে ক্রিকেট নিয়ে তর্ক চলছে। একজন রিকশাওয়ালা খুব আস্তে পুরোনো গান গাইছে।
হাঁটতে হাঁটতে সে একটা ছোট লাইব্রেরির সামনে গিয়ে থামে। ভেতরে পুরোনো বইয়ের গন্ধ, কাঠের তাক একটু বেঁকে আছে, কোণায় ছোট্ট ফ্যান কষ্ট করে ঘুরছে।
বৃদ্ধ দোকানদার তাকান—“কী বই লাগবে?”
অভিক কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে—“মন ভালো করার মতো বই আছে?”
বৃদ্ধ হেসে ফেলেন—“মন ভালো করার বই? ওই জিনিস থাকলে আমি নিজেই পড়তাম।”প
তারপর নিচের তাক থেকে একটা বই বের করেন—“তবে কিছু বই আছে… পড়লে মনে হয়, নিজের মতো মানুষ আরেকজনও ছিল।”
অভিক বইটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বুকের ভেতর ভারটা একটু নড়ে ওঠে।
বাসায় ফিরে সে সেদিন জানালাটা খুলে দেয়। বাইরে হালকা বৃষ্টি, দূরের বিল্ডিং ঝাপসা, বাতাসে ভেজা মাটির গন্ধ। বই খুলে পড়ে, তারপর হঠাৎ থেমে যায়। অনেকক্ষণ বই বন্ধ করে বসে থাকে।
রাতটা বদলায় না, ভেতরের ক্লান্তিও যায় না। তবু কিছুটা হালকা লাগে—যেন আগামীকাল পুরোটা না হলেও একটু সহজ হতে পারে।
পরদিন সকালে সে রান্নাঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়—“চা দিবা?”
মা তাকিয়ে থাকেন, তারপর চুলার আঁচ বাড়িয়ে দেন।
অভিক জানালার পাশে দাঁড়ায়। রোদ ধীরে ধীরে ঘরের মেঝেতে নামে। নিচে একটা ছোট ছেলে সাইকেল শিখছে—পড়ে যাচ্ছে, আবার উঠছে, হাঁটু ঝাড়ছে, আবার চেষ্টা করছে।
অভিক তাকিয়ে থাকে।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।