অক্সিজেন
#enolej_idea
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প। ১৬ জুন ২০২৬
হাসপাতালের করিডোর রাতে কেমন যেন লম্বা লাগে। আলোও কম। মানুষজনও নাই। তবু ভেতরে ভেতরে কেমন একটা ছটফটানি।
বাবা বেডে শুয়ে আছে। নাকে অক্সিজেন মাস্ক। বুকটা আস্তে আস্তে উঠছে নামছে। চোখটা পুরা বন্ধ না, আবার খোলাও না। মাঝামাঝি।
ছেলেটা পাশে দাঁড়িয়ে। হাতে ফোন।
ফোনের স্ক্রিন বারবার জ্বলে উঠছে। মেসেজ, মিসড কল। আর একটা পোস্ট—একটু আগে দিছে। “সবাই দোয়া করবেন, আব্বা হাসপাতালে, অবস্থা ভালো না।” লাইক পড়ছে। কমেন্ট পড়ছে। “দোয়া রইল ভাই।” “আল্লাহ সুস্থ করুক।” ও দেখে। আবার পকেটে রাখে। দুই মিনিট পর আবার বের করে।
নার্স এসে বলল, “অক্সিজেন লাগবে। এখনো স্টেবল না, মনিটরে রাখতে হবে।”
“স্টেবল না”—কথাটা মাথার ভেতর ঘুরতে লাগল। পুরা বুঝি না। খালি খারাপ কিছু মনে হয়। ছেলেটা খালি মাথা নাড়ল।
আশেপাশে সবাই দাঁড়িয়ে। কেউ বসে, কেউ হাঁটে। বারবার জিগায়, “ডাক্তার কী কইল?” উত্তর একটাই—“দেখতেছি।” “মনিটরে আছে।” “রিপোর্ট আসুক।” কেউ আসল কথা পায় না। তবু সবাই শোনে।
ছেলেটা এক কোণায় দাঁড়িয়ে আবার পোস্টটা খুলল। কমেন্ট বাড়ছে। দোয়া বাড়ছে। স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে বাবার দিকে তাকায়। মাস্কের ভেতর বাবার নিঃশ্বাস আস্তে আস্তে চলছে।
এক মামা এসে বলল, “যা, একটু পানি খেয়ে আয়।”
ছেলেটা মাথা নাড়ল। গেল না। ফোন বের করল। লক। আবার পকেটে ঢুকাইল।
রাত বাড়তেছে। করিডোর ফাঁকা। পায়ের শব্দ নাই। খালি মাঝে মাঝে মেশিনের বিপ। বাবার নিঃশ্বাস এখন মাস্কের ভেতরেই আটকা। বাইরে শোনা যায় না। ছেলেটা পাশে বসল। আবার ফোন হাতে নিল।
ডাক্তার আসল। “অক্সিজেনের ওপরই আছে। খারাপের দিকে যাইতে পারে।”
“খারাপের দিকে”—কথাটা রুমের ভেতরেই বসে গেল। ছেলেটা চুপ।
রাত তিনটা। হাসপাতাল একদম চুপ। দূরে দরজা বন্ধের শব্দ। মাঝে মাঝে কাশি। বাবা এখন চোখ বন্ধ। নার্স এসে মাস্কটা ঠিক করে দিয়ে গেল। ছেলেটা পাশে দাঁড়ায়ে আছে। মনে হইতেছে ও কিছু একটা করতেছে। কিন্তু কী করতেছে, নিজেই জানে না।
হঠাৎ ফোন ভাইব্রেট করল। আবার কমেন্ট। “ঠিক হয়ে যাবে ভাই।” “আমরা আছি।”
ও অনেকক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকায়ে থাকল। তারপর ফোনটা আস্তে করে বেডের পাশে রাখল। প্রথমবার মনে হইল, ফোনটা এখানে দরকার নাই।
ভোরের দিকে বাবার নিঃশ্বাসটা কেমন যেন বদলে গেল। ডাক্তার দৌড়ে আসল। নার্স আসল। হইচই একটু। ছেলেটা পাশে দাঁড়ায়ে থাকল। শরীর শক্ত, ভেতরটা কাঁপতেছে। ফোন আর বের করল না।
একটু পরে ডাক্তার বলল, “এখন স্টেবল। তবে অবজারভেশনে রাখতে হবে।”
“স্টেবল”—এইবার কথাটা অন্যরকম লাগল। পুরা ভরসা না, আবার ভয়ও না।
বাইরে আলো ফুটতেছে। ছেলেটা জানালার কাছে গিয়া দাঁড়াইল। হাতে ফোন নাই। মাথার ভেতর খালি একটা কথা—কাউরে জানানো আর পাশে থাকা কি এক জিনিস? নাকি আমরা খালি জানাই, থাকি না?
বাবা এখনো শুয়ে আছে। অক্সিজেন চলতেছে। মেশিন চলতেছে। জীবন চলতেছে—যতটুকু চলে আর কী।
ছেলেটা আবার ফোনটা তুলল। পোস্টটা ওই আছে। “সবাই দোয়া করবেন…” ও কিছুক্ষণ তাকায়ে থাকল। তারপর নিচে স্ক্রল করল। আর কিছু লিখল না।
হাসপাতালের জানালা দিয়া সকাল ঢুকল। আলো পড়ল বেডে, মেঝেতে, দেয়ালে। সেই আলোয় খালি একটা ছোট প্রশ্ন ভার হয়ে থাকল—আমরা কি সত্যি পাশে থাকি, নাকি খালি জানাই?
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।