আয়নার মানুষ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোট গল্প। ১০ জুন, ২০২৬
অফিসে ঢুকেই রাশেদের মনে হলো, দিনটা বোধহয় আবার আগের দিনের মতোই যাবে।
ব্যাগটা টেবিলে রাখতেই একজন লোক এগিয়ে এলো।
"ভাই, একটা অনুরোধ ছিল। ফাইলটা যদি একটু আগে করে দিতেন..."
রাশেদ লোকটার দিকে তাকাল।
"সবারই কাজ আছে। সিরিয়াল অনুযায়ী হচ্ছে।"
লোকটা অপ্রস্তুত হাসল।
"জানি। তারপরও যদি একটু দেখতেন..."
কথা বলতে বলতেই সে একটা খাম টেবিলের কোণে সরিয়ে রাখল।
রাশেদ কয়েক সেকেন্ড খামটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সেটা তুলে লোকটার হাতে দিয়ে বলল,
"খামটা আপনার কাছে রাখেন। ফাইলের যা নিয়ম, সেভাবেই হবে।"
লোকটা আর কিছু বলল না। খামটা পকেটে ঢুকিয়ে চলে গেল।
ঘটনাটা নতুন কিছু না। তবু কেন জানি প্রতিবারই রাশেদের খারাপ লাগে।
দুপুরে ক্যান্টিনে বসে চা খাচ্ছিল। পাশের টেবিলে সহকর্মীদের আড্ডা।
একজন বলল, "এখন এত নিয়ম মেনে চললে হয় নাকি?"
আরেকজন হেসে বলল, "এই দুনিয়ায় বেশি সৎ মানুষই সবচেয়ে বেশি ঠকে।"
কথাটা শুনে সবাই হেসে উঠল।
রাশেদও একটু হাসল। কিন্তু ভেতরে কোথাও যেন একটা অস্বস্তি রয়ে গেল।
বাসায় ফেরার পথে একটা ছোট ঘটনা দেখল।
একটা মোটরসাইকেল রিকশার গা ঘেঁষে চলে যেতে গিয়ে ধাক্কা দিল। খুব বড় কিছু না। কিন্তু লোকটা একবারও পেছনে তাকাল না। গতি বাড়িয়ে চলে গেল।
রিকশাওয়ালা কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল। তারপর আবার প্যাডেলে চাপ দিল।
চারপাশের মানুষও যার যার কাজে ব্যস্ত। কেউ থামল না, কেউ কিছু বলল না।
রাশেদ হেঁটে যেতে যেতে ভাবল, হয়তো এইভাবেই অনেক কিছু স্বাভাবিক হয়ে যায়। প্রথমে খারাপ লাগে, তারপর অভ্যাস হয়ে যায়।
রাতে খাওয়ার সময় ছেলে আদনান বলল,
"বাবা, আজ একটা মজার ঘটনা হয়েছে।"
"কি?"
"আমাদের ক্লাসে একজন নকল করেছে। স্যার ধরতেই পারেনি।"
"তারপর?"
"সবাই বলছে, সে নাকি খুব চালাক।"
রাশেদ চামচটা নামিয়ে রাখল। "তুমি কি মনে করো সে চালাক?"
আদনান কাঁধ ঝাঁকাল।
"জানি না। কিন্তু সবাই তো সেটাই বলছে।"
রাশেদ আর কিছু বলল না।
কথাটা অদ্ভুতভাবে তার মাথায় আটকে রইল। কারণ ছেলেটা নকলের গল্প বলছিল না। সে হয়তো না বুঝেই একটা সময়ের গল্প বলে ফেলেছিল।
একটা সময় ছিল, যখন অন্যায় করে ধরা না পড়লে মানুষ ভয় পেত। এখন অনেক সময় ধরা না পড়াটাই বুদ্ধিমত্তা হিসেবে ধরা হয়।
কয়েক দিন পর রাশেদ গ্রামের বাড়িতে গেল। ফাঁকা সময়ে পুরোনো স্কুলে ঢুঁ মারল।
স্কুলের সামনে সেই বটগাছটা এখনও দাঁড়িয়ে আছে।
গাছটার নিচে বসে ছিলেন হাবিব স্যার। চুল প্রায় পুরো সাদা হয়ে গেছে। কিন্তু মানুষটা একই রকম আছেন।
কিছুক্ষণ এদিক-সেদিক গল্প করার পর রাশেদ বলল,
"স্যার, একটা কথা বলি?"
"বলো।"
"আমার মনে হয় মানুষ অনেক বদলে গেছে।"
স্যার হালকা হেসে বললেন,
"আমার বাবা-ও একই কথা বলতেন।"
রাশেদও হাসল।
স্যার বললেন,
"আচ্ছা, সমাজ বলতে তুমি কাদের বোঝো?"
"আমরাই তো।"
"তাহলে সমাজটা আলাদা কিছু হলো কিভাবে?"
রাশেদ চুপ করে রইল।
স্যার আবার বললেন,
"আমরা চাই সবাই নিয়ম মানুক। কিন্তু নিজের দরকার পড়লে নিয়মটাকে একটু বাঁকাতে আপত্তি করি না।"
কথাটা শুনে রাশেদ মাথা নিচু করল। কারণ কথাটা পুরোপুরি ভুল নয়।
স্যার বললেন,
"সমস্যা হলো, আমরা বড় অন্যায় নিয়ে খুব চিন্তা করি। কিন্তু ছোট অন্যায়গুলোকে তেমন কিছু মনে করি না।"
বাতাসে বটগাছের পাতাগুলো নড়ছিল। কিছুক্ষণ কেউ কথা বলল না।
ফেরার সময় স্যার শুধু একটা কথা বললেন,
"মানুষ সাধারণত আঙুল তোলে অন্যের দিকে। নিজের দিকে খুব কম।"
সেদিন রাতে রাশেদের ঘুম আসতে দেরি হলো।
তার মনে হচ্ছিল, নৈতিকতার সংকট হয়তো একদিনে তৈরি হয় না। অল্প অল্প করে জমে।
যখন আমরা মিথ্যাকে ছোট ব্যাপার ভাবি। যখন অন্যায় দেখে মুখ ফিরিয়ে নিই। যখন নিজের সুবিধাটাকে নীতির চেয়ে একটু বেশি গুরুত্ব দিই।
আর পরিবর্তনও হয়তো বড় কোনো বক্তৃতা দিয়ে শুরু হয় না। খুব ছোট কিছু সিদ্ধান্ত থেকে শুরু হয়।
সত্য বলা। দায়িত্ব নেওয়া। নিজের ভুল স্বীকার করা। আর মাঝে মাঝে নিজের দিকে তাকানো।
পরদিন সকালে অফিসে যাওয়ার আগে রাশেদ আয়নার সামনে দাঁড়াল।
প্রতিদিনই দাঁড়ায়। আজও দাঁড়াল।
মুখটা একই। চোখ দুটোও একই।
হঠাৎ তার মনে হলো, সমাজ বদলানোর কথা ভাবার আগে হয়তো এই মানুষটার হিসাবটাই আগে নেওয়া দরকার।
কারণ আয়নার ওপাশে যে মানুষটা দাঁড়িয়ে আছে, সমাজটা শুরু হয় তার থেকেই।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।