পুরোনো বইয়ের গন্ধ
মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন
ছোটগল্প | ১৬ মার্চ ২০২৬
বিকেলের আলো ফিকে হতে হতে লাইব্রেরির ধুলোমাখা জানালা দিয়ে ঢুকছে। সূর্যের শেষ আলো ধীরে ধীরে তাকগুলোকে এমন এক অচেনা রঙে রাঙাচ্ছে, যা হয়তো কেবল কল্পনায়ই দেখা যায়। সারি সারি বই—হলুদ, ছিঁড়ে, কখনও অচেনা লেখা—দেখতে দেখতে মনে হয়, প্রতিটি বই নিজস্ব নিঃশব্দ ভাষায় ফিসফিস করছে, বলছে, “এখানে ঢুকো, আমাদের গল্প শুনো।”
রাশেদ দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। গন্ধটা একবার নাকে এসে জমে গেল—পুরোনো কাগজ, ধুলো আর সময়ের এমন একটা মিশ্রণ, যা তার কাছে অদ্ভুতভাবে সান্ত্বনাদায়ক। অনেকের কাছে অস্বস্তিকর হলেও তার জন্য এটি কিছুটা আশার ছায়া, কিছুটা অপেক্ষা। মনে হয়, এই গন্ধের ভেতর লুকিয়ে আছে এমন কিছু গল্প, যা কেবল তার জন্য অপেক্ষা করছে।
সে তাকগুলোর কাছে ধীরে ধীরে হাঁটল। মলাট উঠেছে, পাতাগুলো হলদে। অনেক বইয়ের নাম প্রায় অচেনা। তবু তার কাছে তারা অমূল্য। অদ্ভুতভাবে, মনে হয় এই বইগুলো তার নিজের স্বপ্নের অংশ।
রাশেদের বাড়ি ছোট। শহরের প্রান্তে টিনের চালের ঘর। বাবা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দিনমজুরি করেন। মা ঘর সামলান, ছোটখাটো কাজের মধ্যে পরিবারের হিসাব মেলান। নতুন বই কেনা তাদের জন্য বিলাসিতা। পাঠ্যবই জোগাড় করাও প্রায়শই চ্যালেঞ্জের মতো। গল্পের বই বা সাহিত্যিক পড়াশোনা—প্রায় অসম্ভব।
তবু রাশেদের অভ্যাস—বই ছাড়া থাকা অসম্ভব। লাইব্রেরিটি তার কাছে অন্য এক জগৎ। প্রতিদিন স্কুল শেষে সে আসে। নিঃশব্দে বসে থাকে, পাতার শব্দ, কাগজের ফিসফিস—সবই যেন তাকে শেখায়, আর কিছু বলে না।
প্রথম দিন, চারপাশে বই—মনে হচ্ছিল শব্দের জঙ্গল। টেবিলের পাশে বৃদ্ধ লাইব্রেরিয়ান। সাদা চুল, শান্ত চোখ। তিনি একবার তাকালেন,
“পড়তে এসেছ?”
রাশেদ মাথা নেড়ল।
“তাহলে বসো,” হেসে বললেন।
সেই দিন থেকেই লাইব্রেরিটি তার জীবনের অংশ।
বই শুধু গল্প নয়। এগুলো ভাবনার দরজা। একদিন সে পড়ল একজন বিজ্ঞানীর জীবনের কথা, যিনি দারিদ্র্যের মধ্যেও পড়াশোনা করেছেন। অন্য দিন একজন লেখকের কথা, যিনি বহু বছর কেউ পড়েনি তবু লিখেছেন। কখনো ইতিহাস, কখনো ভ্রমণ, কখনো মানুষের মন ও মানসিকতার সূক্ষ্মতা। প্রতিটি বই যেন তার ভিতরে আলো জ্বালায়, এত সূক্ষ্ম যে কখনও তা বোঝা যায় না, কখনও যেন চুপচাপ ছুঁয়ে যায়।
স্কুলে সবাই বোঝে না। বন্ধুদের হাসি আসে, কেউ বলে,
“তুই এত বই পড়ে কী হবি?”
“গরিব মানুষের এত বড় স্বপ্ন মানায় না।”
রাশেদ চুপ থাকে। পকেট ছোট হতে পারে, চিন্তার জায়গা ছোট নয়—এটাই তার দৃঢ় বিশ্বাস।
একদিন লাইব্রেরির এক কোণে সে পুরোনো বই খুঁজে পেল। মলাট ছিঁড়ে গেছে, পাতাগুলো ভঙ্গুর। সে বই খুলল। প্রথম পাতায় লেখা—
“যে এই বই পড়বে, সে যেন স্বপ্ন দেখতে ভয় না পায়।”
নিচে নাম নেই, শুধু প্রায় ত্রিশ বছরের তারিখ। রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। মনে হয়, ঠিক তার জন্য লেখা হয়েছে।
সে লাইব্রেরিয়ানকে জিজ্ঞেস করল,
“এই লেখাটা কে লিখেছিল?”
বৃদ্ধ বইটা হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।
“এক ছেলে ছিল—প্রায় প্রতিদিন এখানে আসত। বই গিলত বলা যায়। তারপর একদিন চলে গেল। বইটা রেখে গেল। ঠিক কি হলো, কেউ জানে না।”
রাশেদ চুপ হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“সে কি সফল হলো?”
বৃদ্ধ কাঁধ ঝাঁকলেন।
“জানি না। তবে এক জিনিস বোঝা যায়—যে ছেলে স্বপ্ন দেখতে শেখে, তাকে থামানো কঠিন।”
সেদিন বাড়ি ফেরার পথে আকাশ লাল-কমলার আলোতে ভরা। সূর্য ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছিল। রাশেদের হাতে বই, মনে হচ্ছিল সে একা নয়। এই পৃথিবীতে তার আগে অনেকেই এসেছে, যারা একইভাবে পুরোনো বইয়ের পাতায় নিজেদের ভবিষ্যৎ খুঁজেছে।
পরদিন আবার বই খুলল। পরিচিত গন্ধ—পুরোনো কাগজ। এবার সে বুঝল, গন্ধ শুধু অতীত নয়। কিছুটা ভবিষ্যতের ইঙ্গিতও আছে। হয়তো একদিন সে শহর ছাড়বে। হয়তো বড় বিশ্ববিদ্যালয়, হয়তো অন্য শহরে নতুন জীবন। সামনে কী আছে সে জানে না। তবে নিশ্চিত—তার স্বপ্ন শুরু হয়েছে এখানেই, এই নীরব লাইব্রেরিতে, ধুলোমাখা তাকের সামনে, সেই গন্ধের ভেতর—পুরোনো বইয়ের গন্ধ।
রাশেদ বইটা বন্ধ করল। লাইব্রেরির দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ পেল না—কানে তখনও সেই গন্ধ, সেই ফিসফিস, সেই অপেক্ষা।
লেখাটি কপি করতে 'অনুলিপি' এ ক্লিক করুন।